বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম শ্রুতকীর্তি নাম ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়'(১৯০৮-১৯৫৬)। বৈজ্ঞানিকদের মতোই তাঁর অন্বেষণ। কোনো ভাবালুতা নয়, কোনো গোঁজামিল নয়, সর্বস্তরের মানুষের যৌনতা, মনস্তত্ত্ব, বিকারগ্রস্ততা যেমন তাঁর বৈজ্ঞানিক বাস্তব দৃষ্টির পক্ষে অন্বিষ্ট বিষয়; তেমনি নিচের তলার সমাজের, মানুষের অসহায় অমানবিক শোষণজনিত অস্তিত্বের সংকট তাঁর রচনাকে বিশিষ্ট করে।

‘প্রাগৈতিহাসিক’ ছোটগল্পটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনস্তত্ত্বমূলক একটি গল্প। এই গল্পের মধ্যে স্পষ্টতই একটি কাহিনী আছে। এটি ভিখু নামের এক দুর্দান্ত ডাকাতের জলবন ইতিবৃত্ত। তার ডাকাতির সূত্র ধরে লেখক চরিত্র ছাড়িয়ে মানব জীবন স্বভাবের আদিমতম বৃত্তি, যৌনতা, ক্ষুধা-তৃষ্ণার Crude বৈশিষ্ট্য একেঁছেন শিল্পের সত্যতায়।

ভিখু এ কাহিনীর নায়ক। সে বসন্তপুরের বৈকুন্ঠ সাহার গদিতে ডাকাতি করতে গিয়ে বর্শার খোঁচা খেয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। সে পালিয়ে তার পরিচিত পেহ্লাদ বাগদীর বাড়ি আসে। পুলিশের ভয়ে পেহ্লাদ ভিখুকে নিজের বাড়ি আশ্রয় না দিয়ে বনে আশ্রয় দেয়। ভিখুর শরীরে অসম্ভব যন্ত্রণা; ঘা, জ্বালাপোড়া, পোকামাকড়ের উৎপাত, জোঁকের ঘা থেকে বিষরক্ত শোষণ– এসব নিয়ে জীবনটাকে টিকিয়ে রাখে ভিখু। ভিখুকে পেহ্লাদ নিজের বাড়ি নিয়ে আনে তার বোনাই ভরতের সাহায্যে। ভিখু একদিন ক্রমশ সুস্থ হয়ে ওঠে এবং একদিন পেহ্লাদের অবর্তমানে তার স্ত্রীর প্রতি লোভের প্রকাশ ঘটায়। এজন্য ভিখু প্রচন্ড মার খেয়ে পেহ্লাদের ঘর ছাড়া হয়। এরপর ভিখু ক্রমশ ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যে এসে জীবন কাটায়।কারণ একটা হাত নষ্ট হওয়ায় ডাকাতি করার শক্তি লুপ্ত হয়। ভিক্ষার পয়সায় তার সাময়িক দিন ফেরে, কিন্তু নারী সঙ্গহীন নিরুৎসাহ জীবন তার কাছে বিরক্তিকর। ভিখু ক্রমশ তার অস্থির জীবন যাপনের মধ্যে পরিচিত হয় বাজারের দগদগে ঘা নিয়ে ভিক্ষারত যুবতী পাঁচীর সঙ্গে। ভিখু পাঁচীর সহচর্য আকাঙ্ক্ষা করে। কিন্তু পাঁচী রাজি হয় না। পাঁচী এক সময় বসির মিয়ার সঙ্গিনী হয়। ভিখুর তা সহ্য হয় না, পাঁচীর সান্নিধ্য কামনা ক্রমশ তীব্র হয় ভিখুর। বসিরকে ভিখু এক গভীর রাতে সরু ধারালো লোহার শিক দিয়ে তারা ভরা আকাশের নীচে অন্ধকারে বসির মিয়াকে নিষ্ঠুর ঈর্ষায় নির্মমভাবে হত্যা করে। পাশে শায়িত পাঁচী জেগে ওঠে। পাঁচীর সাহায্যে বসিরের ভিক্ষালব্ধ সঞ্চিত সমস্ত টাকা, জিনিসপত্র পুঁটলি বেঁধে পাঁচীকে সঙ্গে নিয়ে ভিখু বেরিয়ে পড়ে নতুন ভিক্ষাজীবন এবং সংসারজীবন গড়ার উদ্দেশ্যে। পাঁচীর পায়ে ঘা, হাঁটার কষ্ট, এর জন্য ভিখু তাকে কাঁধে নেয়, চলে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে।

গল্প এখানেই শেষ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই গল্পে স্পষ্টত কাহিনী নিয়েছেন ঘটনাবহুলভাবে। কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু ভিখু। এখানে গল্পকার ভিখু চরিত্রের মাধ্যমে আদিমতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। মনস্তাত্ত্বিক ঘাত-প্রতিঘাত ভিখুর চরিত্রে কাম্য নয়।গল্পের গঠন ও লক্ষ্য দেখে তা বোঝা যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ফ্রয়েডীয় তত্ত্বে’ এবং ‘মার্কসবাদী তত্ত্বে’ বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি সিগমন্ড ফ্রয়েড ও কার্ল মার্ক্সকে ইশ্বর বলেছেন।এ ই গল্পে সিগমন্ড ফ্রোয়েডের মনোঃসমীক্ষণ তত্ত্বের প্রয়োগ দেখিয়েছেন ভিখু চরিত্রের মাধ্যমে। ভিখু চরিত্রটি সম্পূর্ণ ‘ইদে’-এর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর স্পষ্ট প্রমাণ —

“নদীর ধারে খ্যাপার মতো ঘুরিতে ঘুরিতে তাহার মনে হয় পৃথিবীর যত খাদ্য ও যত নারী আছে একা সব দখল করিতে না পারিলে তাহার তৃপ্তি হইবে না।”

“তাহার ছাতি ফুলিয়া উঠিল, প্রত্যেকটি অঙ্গ সঞ্চালনে হাতের ও পিঠের মাংসপেশী নাচিয়া উঠিতে লাগিল।অবরুদ্ধ শক্তির উত্তেজনায় ক্রমে ক্রমে তাহার মেজাজ উদ্ধাত ও অসহিষ্ণু হইয়া পড়িল।”

কোন ব্যক্তি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক রহস্য, জটিলতা ও সুষমা ভিখু চরিত্রে মিলবে না। ভিখু সমগ্র গল্পে যা সক্রিয়তা দেখিয়েছে, তার সবকিছুই মানুষের জীবনের সভ্যতা উদ্ভবের আগের অর্থাৎ আদিম জীবনের অনুষঙ্গ। প্রাগৈতিহাসিক ছোটগল্পটি চরিত্রাত্মক গল্পের শ্রেণীতে পড়ে। ভিখুর আছে প্রাগৈতিহাসিক স্বভাব ও ব্যক্তিত্ব। তারই স্বার্থক চিত্ররূপ ঘটেছে এই গল্পে। এর সমস্যা চরিত্র নিহিত আদিমতার। ভিখুর যে চিত্র -স্বাতন্ত্র্য ও অপূর্ব তাতেই লেখকের লক্ষ্য কেন্দ্রীভূত। গল্পের ক্লাইম্যাক্স বসির মিয়ার হত্যা ও পাঁচীকে পিঠে নিয়ে বিকলঙ্গ ভিখুর হাঁটার ঘটনাতেই স্থির। ভিখুর শেষতম সক্রিয়তা, ভাবকে যেমন গভীরতা দিয়েছে, তেমনি একমুখিনতার শেষ স্তর স্পষ্ট করেছে। গল্পের ইঙ্গিত ধর্ম লেখকের টিকাভাষ্যের মতো শেষতম অনুচ্ছেদে–

“হয়তো এই চাঁদ আর এই পৃথিবীর ইতিহাস আছে কিন্তু ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্রহ করিয়া দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচী পৃথিবীতে আসিয়াছিল এবং যে অন্ধকার তাহার সন্তানের মাংসল আবেষ্টনীর মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক, পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই, কোনদিন পাইবেও না।”

গল্পকারের এই ভাবনা এই গল্পের চাবিকাঠি। এই অনুচ্ছেদে মূলত বোঝানো হয়েছে ভিখুর ভিতর যে আদিমতম প্রবৃত্তি ছিল, সেটা তার সন্তানের মধ্যেও থাকবে। সেই আদিমতাকে সন্তানের কাউকে বুঝতে দিবে না। এই ধারনায় ভিখুর যাবতীয় কর্মের সৌন্দর্য ধরা পড়ে। প্রকৃত অর্থে সবার জীবনের মধ্যেই আছে আদিম প্রবৃত্তি বা ইদের প্রভাব। তার কখনো অবলুপ্তি নেই। তারা মানব বংশের উত্তরাধিকার সূত্রে বাঁধা। তারা গোপন স্বভাব সভ্যতার আলোয় আরও গোপন থেকে যায়। আদিম জীবনের আকর্ষণও মানুষের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত। জৈব প্রবৃত্তি, শ্বাপদবৃত্তি মানুষের রক্ত চিহ্নিত সত্য। তারই প্রতিনিধি ভিখু এবং পাঁচীর গর্ভে ভিখুর সন্তান হয়ে তার সত্য স্বরূপকে বাঁচিয়ে রাখতে সমর্থ হয়।

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]