কাহিনী সংক্ষেপ: ভাড়াটে খুনি সাইকেরিয়াস একটা খুন করতে বারগেন্ডিতে এসে দেখে তার চেয়েও বহুগুণ নৃশংসতায় কাজটা কেউ আগে সেরে রেখে গেছে! পালাতে গিয়ে ধরা পড়ায় মাথার ওপর ঝুলে যায় মৃত্যুদণ্ডাদেশের খড়গ। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে ন্যাচারস টেম্পল এর মূখ্য কুহকী সিলা। শর্ত– মৃত্যুর ওপারের জগত ‘ক্যাসল ডেথ’ থেকে খুনির নাম এনে দিতে হবে; সন্ধ্যার আগে ফিরতে না পারলে চিরতরে আটকা পড়তে হবে মৃতদের জগতে। জান বাঁচাতে মৃতদের জগতে গিয়ে সাইকেরিয়াস দেখল মৃত্যুর চেয়েও ঘনঘোর বিপদের মুখে পড়েছে সে এবং তার পৃথিবী।


পর্যালোচনা: ফ্যান্টাসি জনরাটি এদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন বলে বইটি নিয়ে আলোচনার আগে দুটো কথা খরচ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ঈশ্বর যদি ঈশ্বর না হতেন তাহলে সম্ভবত ফ্যান্টাসি রাইটার হতে চাইতেন। কারণ ঈশ্বরের পর একমাত্র ফ্যান্টাসি রাইটারের পক্ষেই সম্ভব একেকটি নতুন মহাবিশ্ব-দেশ-জাতি-ভাষা-জীব সৃষ্টি করা। পার্থক্য– ঈশ্বরের সৃষ্টি বাস্তব, ফ্যান্টাসি রাইটারের সৃষ্টি ভার্চুয়াল বা অবাস্তব। দুনিয়ার বুকে জেগে থাকা এইসব ক্ষুদে ক্ষুদে ভার্চুয়াল ঈশ্বরদের একজন হলেন এদেশের আশরাফুল সুমন। ড্রাগোমির, কুয়াশিয়া, অন্তিম শিখার মতো একের পর এক হাই ফ্যান্টাসি লিখে চলেছেন তিনি।

ঘরানার দিক চিন্তা করলে অন্তিম শিখাকে গ্রিমডার্ক ফ্যান্টাসির খাতায় ফেলতে হয়। কারণ, এখানে আলো-আঁধারের চিরন্তন লড়াই, ভায়োলেন্স ইত্যাদি মূল উপজীব্য হিসেবে ধরা দিয়েছে। সেই সাথে তাঁর অন্যান্য রচনার মতো এটিও হাই ফ্যান্টাসি তো বটেই এবং কিছুটা এপিকধর্মীও। উল্লেখ্য যে, এর আগে এই ধরণের জঁর ফিকশন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কাজ হয়নি। কাজেই এই কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, আশরাফুল সুমন– বাংলা হাই, এপিক অথবা গ্রিমডার্ক ফ্যান্টাসির জনক। বিশ্বের আর সব দিকের মতো সাহিত্যের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। পাশ্চাত্যের একটি লিটারারি মুভমেন্ট এদেশে আসতে একশো-দু’শো বছর লেগে যায়, ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি। যেমন সনেটের কথা যদি ধরা হয়, ইংরেজি ভাষায় প্রথম সনেট লেখেন থমাস ওয়েট, বাংলা ভাষায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত। থমাস ওয়েট থেকে শেক্সপিয়র হয়ে মধুসূদনের হাতে সনেট আসতে কেটে গেছে প্রায় তিনশো বছর। একইভাবে মডার্ন ফ্যান্টাসির জনক জর্জ ম্যাকডোনাল্ড ‘দি প্রিন্সেস অ্যান্ড দি গবলিন’ নামক ফ্যান্টাসি লেখেন ১৮৫৮ সালে। অথচ বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘদিন ধরে এই জনরাটি অবহেলিত ও অচর্চিত অবস্থায় পড়ে ছিল। এপার বাংলা কিংবা ওপার বাংলার কোনো লেখক ফ্যান্টাসি রচনার দিকে মনোনিবেশ করেননি। কেবল সেবা থেকে প্রকাশিত ‘রহস্য পত্রিকা’য় কিছু লো ফ্যান্টাসি গল্প দেখা যেত যেগুলোকে আসলে মূলধারার ফ্যান্টাসি না বলে ফ্যান্টাস্টিক কিছু উপাদানে তৈরী সাধারণ গল্প বলাই ভালো। বছর কয়েক আগে আশরাফুল সুমন এই ঘরানার সিরিয়াস লেখক হিসেবে আবির্ভূত হন এবং অনুবাদের পাশাপাশি একের পর এক মৌলিক হাই ফ্যান্টাসি গল্প ও উপন্যাস লিখতে থাকেন। যদিও এই সময় ফ্যান্টাসির একটি সাবজনরা কনটেম্পোরারি ফ্যান্টাসি নিয়ে কিছু কাজ হয়– যেমন শরীফুল হাসানের ‘সাম্ভালা’, তানজিম রহমানের ‘আর্কন’ প্রভৃতি মিথনির্ভর থ্রিলারগুলোকেও অনেকে কনটেম্পোরারি ফ্যান্টাসির খাতায় ফেলে থাকেন। কিন্তু এই থ্রিলারগুলোর কাহিনীর সেটিংস আমাদের চিরচেনা পৃথিবী– যাকে প্রাইমারি ওয়ার্ল্ড বলা হয়। তাছাড়া সাম্ভালা জগতের অস্তিত্ব হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মীয় মিথ হিসেবে এবং আর্কন দানবের অস্তিত্ব জরথ্রুস্ট ধর্মীয় মিথ হিসেবে আগে থেকেই বিদ্যমান আছে। মিথের সাথে ফ্যান্টাসির পার্থক্য হলো– মিথ হাজার বছর ধরে তৈরি হয় লোকমুখে, অপরদিকে ফ্যান্টাসি হলো সেই মিথ যার জন্ম দেন একজন মাত্র লেখক। সেই বিচারে বলা হয়, সাম্ভালা ও আকর্ন প্রকৃতপ্রস্তাবে দুটি মিথনির্ভর থ্রিলারের অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ এবং আশরাফুল সুমনের ‘ড্রাগোমির’ বইটি দিয়েই বাংলা হাই ফ্যান্টাসি উপন্যাসের যাত্রা শুরু হয়। এই উপন্যাসেই আমরা তাঁকে প্রথম চিরচেনা পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ফ্যান্টাসি জগৎ (সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ড) তৈরি করতে দেখি।

আমাদের দেশে ফ্যান্টাসি সাহিত্য এখনও ততটা জনপ্রিয় নয় বলে ফ্যান্টাসি লেখকরাও পাদপ্রদীপের আড়ালে রয়ে যাচ্ছেন। গুগলানুসন্ধান করে বিশ্বের সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রিত দশ-বিশটা বইয়ের নাম খুঁজলে দেখা যায়, দুই-চারটা বাদে সবই ফ্যান্টাসি। আজ আমরা যে গেম অভ থ্রোনস, হ্যারি পটার নিয়ে মাতামাতি করি এগুলো আসলে হাই ফ্যান্টাসি বৈ কিছু নয়। ‘অন্তিম শিখা’ এগুলোর মতোই এক হাই ফ্যান্টাসি। এমন একটি ক্ষুদ্র নভেলায় আশরাফুল সুমন এক বিস্ময়কর কল্পনাজগৎ তৈরি করে তাঁর সৃজনীশক্তির মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। এই জগতের নিয়ম-নীতি, ধরণ-গড়ন আমাদের জগত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। হ্যারি পটারের জাদুর দুনিয়ার চেয়ে কোন অংশেই কম অদ্ভুত নয় ‘অন্তিম শিখার’ জাদুজগত ‘বারগেন্ডি’, মৃত্যুর ওপারের দুনিয়া ‘ক্যাসল ডেথ’। মাদার ন্যাচার গাইয়া থেকে ক্যাওস, মিনোসের মতো কাল্পনিক দানব সৃষ্টি লেখকের মৌলিক চিন্তননৈপুণ্যের চিহ্ন বহন করছে। এখানে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা জন্ম দেয় টান টান উত্তেজনার। লেখার সাথে পাঠককে বেঁধে রাখার অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা আশরাফুল সুমনের রয়েছে। তাঁর চরিত্র চিত্রণ দেখে সহজেই অনুমিত হয় তাঁর সাহিত্যকুশিলতা। সাইকেরিয়াস, সিলা, রেইনা সহ প্রতিটি চরিত্র রক্তমাংশের মানুষের মতো ঠাহর হয় কাহিনীর অভ্যন্তরে। সংলাপের মাঝে মাঝে লেখকের নিরাসক্ত ভঙ্গিতে পাঞ্চ ছুঁড়ে দেওয়া তাঁর সূক্ষ্ম রসসিক্ত মননের প্রকাশ ঘটিয়েছে। ক্লাইম্যাক্সমোড়া কাহিনীর স্থলে স্থলে টুইস্ট এবং স্টেক গল্পকে সর্বোচ্চ গতি দান করে আনপ্রেডিক্টেবল ফিনিশিংয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। পরিশেষে একটি পরিণত পরিণতি গল্পকে চূড়ান্ত সার্বিকতা দিয়েছে যা পাঠক মনের জন্য নিঃসন্দেহে তৃপ্ততা সঞ্চারী। তবে লেখকের ন্যারেটিভ স্টাইলে ঈষৎ অনুবাদ-সাহিত্যের গম্ভীর্য লক্ষণীয় যা গল্পের মসৃণ প্রবাহকে খানিকটা ক্ষুণ্ন করেছে। বাক্যের পদগুলো ঘষামাজা বা প্রয়োজনবোধে ঈষৎ স্থানান্তরিত করে একটু নিরীক্ষা চালালে আরো ঝরঝরে ভাষা বের করে আনা সম্ভব ছিল।

সারা বিশ্ব যখন ফ্যান্টাসি জ্বরে কম্পমান তখন এদেশের পাঠক সমাজের ফ্যান্টাসিবিমুখতা আমাদের ভাবায়। কাজেই পাঠককে অধিক আকৃষ্ট করে তুলতে ফ্যান্টাসি গল্পে দেশীয় আবহ বা রঙ সৃষ্টি করা যায় কিনা তা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালানোর অবকাশ লেখকের রয়েছে।

পরিশেষে, ‘অন্তিম শিখা’ স্বার্থক বাংলা গ্রিমডার্ক ফ্যান্টাসি-প্রয়াসের প্রথম অভিজ্ঞান, একটি বিশ্বমানের নিরীক্ষণ। বইটি বাংলা জঁর ফিকশন জগতের রুবি হয়ে থাকবে।


এক নজরে বই সম্পর্কিত তথ্য:


বই : অন্তিম শিখা
লেখক : আশরাফুল সুমন
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান : রোদেলা
পৃষ্ঠা : ১২৮
মুদ্রিত মূল্য : ২০০ টাকা
ISBN No.: 9789849311768

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]