সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আজও ডান পাটা দু’বার হড়কে গেল। তবু বাধাবিঘ্ন কাটিয়ে মেট্রোটা পেলাম। এমনিতেই আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিনদিনের ছুটির পর জয়েনিং-এ লেট হলে বস্ চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়ত। এতটুকু মায়া-দয়া নেই লোকটার!

ভিড়ে ঠাসা মেট্রোয় অফিসটাইমে কালীঘাট থেকে সিট পাওয়ার কোনও চান্সই নেই। বাড়ি বসেই বুঝেছিল মা। বের হওয়ার সময় তাই পইপই করে বলল,

– বাবু, হাতটা কিন্তু বেশ কমজোরি! জেনারেল সিট তো পাবি না! ওই প্রতিবন্ধী-প্রবীণদের যে সিট থাকে, সেখানেই বসবি। লোকজন সিট না ছাড়লে হাতের প্লাস্টারটা দেখাবি ভালো করে। একটু আঃ, উঃ করবি। তোকে ব্যথায় কাতরাতে দেখে সবাই ঠিক জায়গা ছেড়ে দেবে।

আমাকে এমন কিছুই করতে হলো না। ওই প্রতিবন্ধী-প্রবীণদের সিটে দু’জন স্কুলস্টুডেন্ট বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। আমাকে দেখতে পেয়ে ওরা নিজেদের মধ্যেকার ব্যবধান আরও কমিয়ে আনল। বাঁ হাতটাকে স্বস্তি দিয়ে ডানদিক ঘেঁষে আমি বেশ আরামেই বসলাম।

আসলে হয়েছে কী! চারদিন আগে ছাদের সিঁড়ি দিয়ে মোবাইল ফোনে মগ্ন হয়ে নামতে নামতে কাণ্ডটা ঘটিয়েছি। জখম বাঁ হাতের কবজির হাড়। দেড় মাসের ধাক্কা। দু-তিনদিন অসম্ভব যন্ত্রণা হয়েছে। ভিডিও কলের সাহায্যে বসের বিশ্বাস অর্জন করে তিনটে দিন ছুটি পেয়েছিলাম। আজ থেকে আর রেহাই নেই। কাল রাত থেকে মায়ের ঘ্যানঘ্যানানি,

– এই অসুস্থ ছেলেটা এত্ত দিন কী করে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করবে?

মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়েও কিছুটা ইতস্তত বোধ হলো। মেট্রোয় নেটওয়ার্ক ঠিকঠাক পাওয়া যায় না। দমদম পৌঁছেই না হয় কল করব মাকে। অবশেষে হেডফোন গুঁজে চোখ বুজে অরিজিত্ সিং-এ ডুবলাম।

রিংটোনের আওয়াজে চোখ মেললাম। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ দিতেই দেখি– মা কলিং। কল রিসিভ করেও কোনও লাভ হল না। একটা কথাও শুনতে পেলাম না। মা-ই কেটে দিলো কলটা। জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখি সেন্ট্রালে ঢুকল মেট্রো।

আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন দু’জন মধ্যবয়স্ক অফিসযাত্রী। নতুন গান খুঁজতে খুঁজতে ওদের কথাবার্তা কানে এলো,

– কী দিনকাল পড়ল! ছেলেটাকে পর্যন্ত জায়গা ছাড়েনি!

– এবার যদি কিছু বলতে যাই, তেড়ে আসবে! ডিসগাস্টিং!

নজর গেল ছেলেটার দিকে। বয়স কুড়ির কমই হবে। পিঠে একটা ভারী ব্যাগ। পায়ের দিকে চোখ পড়তেই মনে জমা সব প্রশ্নের উত্তর পেলাম। ছেলেটার বাঁ পা নেই। নেই মানে, একটা কৃত্রিম পায়ের মতো কিছু। সবটা ঠিক বুঝলাম না। অমন একনাগাড়ে তাকানো যায় নাকি!

বেশ রাগ হলো সহযাত্রীদের প্রতি। ওদিকের সিটে সকলেই ষাটোর্ধ্ব। কিন্তু আমার পাশে তখনও সেই দুই ছাত্রই। দু’বার না ভেবে তখুনি সব গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালাম,

– এই যে ভাই, এখানে বসো।

প্রত্যাখ্যানের আনন্দ! এর আগে কখনও পাইনি। কী গভীর সেই অনুভূতি! আহা!

– না, দাদা। আমি ঠিক আছি। আপনি বসুন।

জবাব দিতে এক মুহূর্তও সময় নিল না।

ধীরে ধীরে অনেকটা ফাঁকা হয়েছে কম্পার্টমেন্ট। বসার সিট না থাকলেও দাঁড়ানোর জায়গা প্রতুল। আমি ততক্ষণে গুছিয়ে বসেছি আবার। আর গান শোনার ইচ্ছে হচ্ছে না। মাঝেমধ্যেই ছেলেটার দিকে নজর যাচ্ছে। আর কী এক অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে! হ্যাঁ, সেই সাথে নিজের অন্তরের দীর্ণতার জন্য লজ্জিতও হচ্ছি সমান্তরালে।

শ্যামবাজারে জেনারেল সিট বেশ ফাঁকা হলো। পা-টাকে বড্ড কষ্ট দিয়ে ছেলেটা এগিয়ে গেল সেদিকে। চারিদিকের উৎসুক নজরগুলোর দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করেই জেনারেল সিটে বসল সদর্পে।

– হ্যাঁ, মা শুনতে পাচ্ছি বলো। নেমেছি। না, না। ভিড়ে যাচ্ছি না। সাইডে দাঁড়িয়ে আছি। হাত ঠিক আছে। বসতে পেরেছিলাম।

নিরাপদ একটা কোণে মায়ের সাথে কথা বলতে বলতেই দেখলাম, দমদম মেট্রো স্টেশনের জনসমুদ্রের মধ্যে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল ছেলেটা।

লেখক পরিচয়

Avatar
অরিন্দম রায় চৌধুরি
[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]