দুই হাতে গোটা চারেক পলিথিনের প্যাকেট ভর্তি জামাকাপড় নিয়ে মলের এক্সিট থেকে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল কোয়েনা। অনেকগুলো পছন্দের জিনিসপত্র কিনেছে, প্রায় চার হাজার খরচ করে। মেজাজটাও তাই বেশ ফুরফুরে। রওনকের পাঞ্জাবীটা যা ঝ্যাক্কাস হয়েছে না! নিজের শাড়ীটাও খুব ভালো হয়েছে। হলুদ বরাবরই খুব পছন্দের। দুজনেরই। লিভ টুগেদার-এর বর্ষপূর্তি আজ। ভাড়ার ফ্ল্যাটে আনন্দের বন্যা বইবে আজ। শীতোতাপ নিয়ন্ত্রিত বহুজাতিক বাজার থেকে ফুটপাতে নেমে একটু গরম লাগলেও খুশিতে যেন হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছিলো কোয়েনা। একটা রেড ওয়াইন নিতে হবে, রওনককে কন্ট্রাসেপটিভের কথা বলে দিয়েছে। একটা ঝিম ঝিম আনন্দ আর কুয়াশার মত নেশা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তাকে। রওনককে ধরবার জন্য জিনসের পকেট থেকে টাচ-সেলটা বার করে সবে কল করতে যাবে, হঠাৎ কিসে একটা হোঁচট খেল কোয়েনা। মোবাইলটা ছিটকে গেল, নিজেও হুমড়ি খেয়ে পড়লো একটা লোকের উপর। জামাকাপড়ের প্যাকেটগুলো গড়াগড়ি দিচ্ছে ফুটপাতে। কোথা থেকে যেন রে রে… করে ছুটে এল দু’টো মেয়ে। ফুটপাতের রেলিংটা ধরে কোনমতে উঠে দাঁড়াতেই সেই আধময়লা জামাকাপড় আর রুক্ষ মাথার ছন্নছাড়া মেয়ে দু’টো বাংলা-হিন্দি মেশানো ভাষায় তাকে কত কিছু বলতে লাগলো। একটা বাচ্চার চরম চিৎকার আর ওই গালিগালাজে হতবুদ্ধি কোয়েনা রাগ করতেই ভুলে গেছে। তার ঠিক সামনে একটা বছর খানেকের বাচ্চা তারস্বরে কাঁদছে। কোয়েনা তার উপর আছড়ে পড়েছে, তাই লাগেনি কিন্তু বাচ্চাটার লেগেছে। বাচ্চাটার সামনে একটা চূর্ণ বিচূর্ণ সস্তার খেলনা মোবাইল। তার ঠিক সামনে কোয়েনার বাইশ হাজারের বিদেশী মোবাইল। প্লাস্টিকের একটা টুকরো কোয়েনার জুতোতে আটকে আছে। ফুটপাতের সংসার, ভাঙাচোরা কড়া, খুন্তি, উনুন, জ্বালানি কাঠ লন্ডভন্ড হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে গেছে। একটা চটের উপর কয়েকটা খারাপ হতে থাকা মুসুম্বি, কয়েকটা ছড়িয়ে গেছে এদিক ওদিকে। এভাবেও বাঁচা যায়? সমস্ত সত্ত্বা নিয়ে যেন সেই ফুটপাতে আছড়ে পড়লো কোয়েনা। একটা অদ্ভুত কষ্ট গলার কাছে এসে জমা হয়ে গেল তার। তখুনি দেখলো, সেই বাচ্চাটার মা বোধহয়, কোনমতে আধময়লা, আধছেঁড়া সালোয়ারে শরীরটাকে ঢেকে ব্যস্ত হয়ে প্যাকেটের মুখ ফেটে বেরিয়ে আসা তার মোবাইল, দামী শাড়ী, জামা-কাপড়গুলো সুন্দর করে গুছিয়ে তার হাতে তুলে দিতে এসেছে। বাচ্চাটা তখন কান্না ভুলে প্রাণপনে ভাঙা মোবাইলের টুকরোগুলো জড় করে জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। কোয়েনার চারপাশের পৃথিবীটা কেমন যেন গুমোট আর ভারি হয়ে উঠলো।

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]