অটোর সামনে বসা মেয়ে রোমানকে চমকে দিয়ে বলল, আমি চিনি উত্তরা গণভবন।

রোমান মোবাইলে কথা বলছিল। মোবাইলের ওপ্রান্তজনকে খুব আবেগ নিয়ে বলছিল, ট্রেন থেকে নেমে অটো নিয়েছি। কিন্তু এই অটোটা তো উত্তরা যাবে না। বলছিল আবার নাকি কোথা থেকে আরেকটা অটো নিতে হবে…

কথা শেষ হবার আগেই মেয়েটার অত্যুৎসাহী উত্তর! তা-ও বেশ জোরেই। বিব্রতকর অবস্থা। কী বলবে বুঝতে না পেরে একটা অপ্রস্তুত হাসি উপহার দিল। মেয়েটার ছিপছিপে ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি। যেন সে রোমানের একটা মহা উপকার করে ফেলেছে। সেই তৃপ্তির আভা ঠোঁটের পেলবতা ছাড়িয়ে ভিড় জমিয়েছে চোখে। ঝিলিক খেলে যাওয়া চোখ থেকে তা রোমানের দিকেও হাত বাড়াল। সেটাকে খুব বেশি এগুতে না দিয়ে সে মনযোগ দিল মোবাইলের ওপ্রান্তে থাকা আরেক জনের দিকে। ভাঙাচোরা রাস্তা। অটো তো নয়, যেন অশান্ত সাগরে ছোট্ট একটা ডিঙি নাও।

হ্যাঁ বলো, তারপর?

তারপর কোন দিকে? দাঁড়াও, সেটা পরে বলছি। তার আগে বল, তোমার পাশে যে কথা বলল, সে মেয়েটা কে?

এ রকম একটা উল্টো প্রশ্ন যে হতে পারে, রোমান কল্পনাও করেনি। একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তোতলাতে তোতলাতে বলল, কো-কোন্ মেয়েটা? সে তো আমার পাশে নেই, সামনে।

সামনে? আরেকটা ধমক খেল সে।

আরে, কী যন্ত্রণা! মেয়েটাকে সে চেনে না পর্যন্ত! কিন্তু অদ্ভুত! আর এই মেয়েটাই বা কেন হুট করে বলতে গেল গণভবন সে চেনে! তাকে কি কেউ জিজ্ঞেস করেছে! ইদানীং মেয়েরা কি বেশি মাত্রায় হ্যাংলা হয়ে যাচ্ছে? আচ্ছা, বললই বা, এত জোরে বলতে হবে? এখন সে কী উত্তর দিবে? ভাবতে ভাবতে একটু সময় নিয়েই ফেলল রোমান। চমকে উঠল আবার একটা কড়া ধমক খেয়ে। মোবাইলের ওপাশ থেকে আসা ধমকটা যেন তার সামনে বসেই কেউ দিল!

কী হলো, কথা বলছ না কেন?

শোন, মেয়েটাকে তো আমি চিনি না। কেন ব…

চিনি না মানেটা কী? ভালোই তো! আসছ আমার সাথে দেখা করার জন্য, আর রাস্তায় বসে বসে প্রেম করছ আরেক জনের সাথে!

শোন… আসলে…

কোন আসলে নকলে নেই। তুমি আমাকে কাঁদাবে, এই তো? ঠিক আছে, কাঁদাও… বলেই কাঁদতে লাগল মোবাইলের ওপাশের জন– ত্রপা। ত্রপা হচ্ছে রোমান-এর চার বছরের প্রেম। ফেসবুকে পরিচয়। তারপর অনড় চার বছর। দীর্ঘ সময়ের সম্পর্ক। গভীর।

আজ এর আর ওর– ওদের দুজনের প্রথম দেখা। এক অসম্ভব পুলক সারা মনে। অবশ্য এই মাত্র তা কমতে শুরু করেছে। তা-ও একটা অপরিচিত মেয়ের জন্য! যাকে সে চেনেই না, তাকে কেমনেই বা তার প্রেমিকা চিন্তা করল ত্রপা! শুরুতেই এ রকম অবিশ্বাস!

নিজেকে একটু সামলে নিল রোমান। পরিস্থিতি সামলাতে হবে। কী বলবে ত্রপাকে তা গোছাতে লাগল। কিন্তু কিছুই মনে এল না। আমতা আমতা করে বলতে লাগল, শোন প্লিজ… এভাবে..

আবার একটা ধমক খেল রোমান। ত্রপা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, মেয়েটাকে সাথে করে আনবে তুমি। যদি আনতে না পারো, আসবে না এখানে। ভাবব, আমি তোমার ভালোবাসা পাইনি, পেয়েছে ওই মেয়েটা।

শোন, শোন…

তার সাথে কথা বলে দেখব, সে কে, কেন তোমার সাথে একসাথে অটোতে বসেছে। এক নিঃশ্বাসে এতকিছু বলেই কেটে দিল লাইনটা। রোমান হ্যালো বলতে গিয়েও পারল না।

সামনে তাকিয়ে দেখে, মেয়েটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। শুধু মেয়েটা নয়, অটোর বাকি তিনজন যাত্রী যেন সাতসকালে মজার এক চিড়িয়া পেয়ে গেছে! মিটিমিটি হাসি সবার আড় চোখে। আচ্ছা, ওরা ত্রপার কথা কি কিছু শুনতে পেয়েছে? একটা লজ্জাপ্রবণ গাল ভেসে উঠল মুখে। সামনে বসা মেয়েটা বোধ হয় সবকিছুই বুঝতে পেরেছে। সহানুভূতি নিয়ে বলল, চিন্তা করবেন না, আমি চিনি। ওদিক দিয়েই যাব। আপনাকে সাথে করে নিয়ে যাব।

একটা শুষ্ক হাসি শুধু দিতে পারল সে। কিন্তু মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হলো। মনে হলো, কষে একটা থাপ্পড় দিই, ভ্যাবলা মেয়ে কোথাকার! যতসব আপদ, যতসব নষ্টের গোড়া। এত সুন্দর একটা সময় নিশ্চয় তামা তামা হয়ে যাবে। ফোন দিয়ে তারিখ বদলাবে নাকি! পরক্ষণেই চিন্তাটা বাদ দিল সে। এত দূর থেকে চাইলেই রোজ রোজ আসা যাবে না! সেই কোথায় সিলেট! এই দেখা করতে তাকে কেবল টানা বারো ঘণ্টা জার্নিই করতে হয়নি, মিথ্যে অজুহাতে অফিস ছুটিও নিতে হয়েছে! আর তাছাড়া এ ধরনের প্রস্তাব দিলে নির্ঘাত সন্দেহটা পাকাপোক্ত হবে। তারচে এই মেয়েটাকে কিভাবে ত্রপার কাছে নেয়া যায়, সে বুদ্ধি করতে হবে। কথা বললে, নিশ্চয়ই ওর ভুল ভাঙবে। মেয়েটা তো ওদিক দিয়েই যাবে। একটু রিকোয়েস্ট করে দেখতেই পারে। প্রয়োজনে সব কিছু বুঝিয়ে বলবে। যে মেয়ে না চাইতে উপকার করতে এগিয়ে আসে, সে নিশ্চয় তার এই বিপদে না বলবে না। এসব ভাবতে ভাবতেই কেমন করে যেন সময় পার হয়ে গেল। অটো থেকে নামতে হবে। মেয়েটার পিছু পিছু সে আরেকটা অটোতে গিয়ে উঠলো। এই অটোটা গণভবনে যাবে।

⊗⊗⊗


২.

উত্তরা গণভবন। শুরুতেই চোখ আটকে গেল ঘড়িটাতে। সিংহদরজাটাও বেশ দৃষ্টিনন্দন। জমিদারি সৌন্দর্য লেগে আছে প্রতিটি স্থানে। কিন্তু সেসবে মন দিল না রোমান। ত্রপার সাথে আজ সারাটা দিনই তো আছে। তখন সব ঘুরে ঘুরে দেখা যাবে। জানাও যাবে অনেক কিছু।

মেয়েটাকে রাজি করানো গেছে। দুটো টিকিট নিয়ে ঢুকল গণভবনে। ভিতরে ঢুকে খালব্রিজ পার হয়ে হাতের ডানে। ঠিকানা জানা ছিল। সানবাঁধা বকুল গাছ। মেয়েটাই বলল, আগে এখানে সাধারণের প্রবেশ ছিল না। কয়েক বছর ধরে সরকার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে এই ঐতিহাসিক জায়গাটি। মেয়েটা হয়তো একটু আধটু ইতিহাসও বলল। আগে এর নাম ছিল দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি। দিঘাপতিয়ার রাজা ১৯৪৭ সালে ভারতে চলে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুই রাজবাড়িটির নাম রাখেন উত্তরা গণভবন। এ ধরনের আরও কিছু তথ্য। কিন্তু রোমানের মন আপাতত সেদিকে নেই। তার সবটুকু জুড়ে ত্রপা। রাস্তায়, সবুজ লনে তার দৃষ্টি কেবল একজনকেই খুঁজছে এখন।

হাতের ডানে ঘুরতেই রোমান সানবাঁধানো একটা বড় গাছ দেখল। এটা কি বকুল গাছ? গাছ সম্পর্কে সে বেশ অজ্ঞ। মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবে কি? ভাবতে ভাবতে তাকাল তার দিকে। মেয়েটা বলল, এই গাছটার নাম বকুল।

রোমান অবাক না হয়ে পারল না। এই মেয়েটা কি তার মনের কথাও শুনতে পায়?

দুজনে এসে দাঁড়াল বকুল গাছের নিচে। মেয়েটা বকবক করেই চলেছে– বকুল ছাড়াও এখানে কিন্তু অনেক দুষ্প্রাপ্য গাছ আছে। অপরাজিতা, কর্পূর, হৈমন্তী, ষষ্টিমধু, বনপুলক, সেঁউতি, তারাঝরা, মাধবী…

জায়গাটা সত্যিই খুব সুন্দর। এখানেই ত্রপার আসার কথা। পরবে নীল শাড়ি। মাথায় থাকবে রঙ্গন। রোমান কথামত পরে এসেছে নীল শার্ট আর এ্যাস কালারের গ্যাবার্ডিন প্যান্ট।

মেয়েটা বলল, ভাইয়া, এটাই কি সেই জায়গা?

হ্যাঁ, ধন্যবাদ।

তাহলে এখন আসি, ভাইয়া?

রোমান মরিয়া হয়ে বলল, না, না, প্লিজ। যাবেন না। একটু ওয়েট করুন। এত বড় উপকার করলেন। ওর সাথে দেখা করে যান। খুশি হবে।

মেয়েটা বলল, ও আচ্ছা। ঠিক আছে। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারব না। আ, একটা প্রশ্ন করি?

জ্বি, করুন।

কতদিনের? প্রথম দেখা বুঝি? হুমম, আমি অবশ্য আগেই আন্দাজ করেছিলাম।

কিছু না বলে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল রোমান। মেয়েটা বলল, এত লজ্জার কী আছে ভাইয়া? আর একটা কথা। নাটোরের সব মেয়েই কিন্তু বনলতা নয়। তাকে দেখার পর যদি আপনার পছন্দ না হয়? কী করবেন?

রোমান কী বলবে বুঝতে পারছে না। পছন্দ কেন হবে না, সে তা বুঝল না। ফেসবুকে যেমন দেখেছে, তেমন হলে পছন্দ না করার তো কোন কারণ নেই। আর যদি তেমন না হয়! মেয়েটার প্রশ্নে তো যুক্তি আছে! এভাবে তো কখনই সে ভাবেনি। কী করবে সে, যদি এমন কিছু ঘটে? যদি ঘটে, কেন ভালবাসবে সে মেয়েটাকে? শুরুতেই যে মেয়ে এত বড় ছল করতে পারে, তাকে কেন বিশ্বাস করবে সে? তবু একটা কিছু বলা দরকার। আপাতত নেগেটিভ কিছু বলা ঠিক হবে না। রোমান ডিপ্লোম্যাটিক উত্তর দিল, ওকে পছন্দ করি, ভালোবাসি বলেই তো এত দূর থেকে এসেছি।

মেয়েটি কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ভাইয়া, আবার একটা ফোন দেন উনাকে।

দিচ্ছি তো। ধরছে না!

ফাঁকি দিচ্ছেন না তো? উনি সত্যি সত্যি আসবেন?

আসবে না কেন? আসবে নিশ্চয়। কোন কারণে দেরী হচ্ছে হয়তো!

বুঝতে পারছি, উনাকে খুব ভালোবাসেন আপনি। আচ্ছা, কিভাবে চিনবেন? কী পরে আসবেন উনি?

লজ্জায় লাল হয়ে উঠল রোমানের গাল। মাথা না তুলেই বলল, নীল শাড়ি।

শাড়ি আপনার খুব পছন্দ?

না, তা নয়। আমার থ্রিপিসই পছন্দ। কিন্তু ওর শাড়ি খুব প্রিয়। তাই… রোমান ত্রপার হয়ে একটা কৈফিয়ত দাঁড় করানোর চেষ্টা করল। আর কী বলবে বুঝতে পারছে না। মেয়েটির দিকে তাকাল। বুঝতে পারল না– চোখেমুখে এক ধরনের দুষ্টুমি খেলা করছে! নাকি মেয়েটার চেহারাটাই এমন! নার্ভাস গলায় বলল, চলুন, একটু বসি। আপনার আপত্তি নেই তো?

না, না। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারব না।

বসতে বসতে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, নাটোরে আপনি কখনো আসেননি, না?

না। এ-ই প্রথম।

কী একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল রোমান। একেবারে নাক বরাবর দুটো পা দেখে থমকে গেল। দুরু দুরু বুকে চোখ উঠাল একটু উপরে। পরনে শাড়ি না। থ্রিপিস। কাঁপুনিটা কমল একটু। ভাবল, ত্রপা নয় নিশ্চয়। কিন্তু সে খুব কম সময়ের জন্য। আকাশি রঙের থ্রিপিস বেয়ে আরও উপরে উঠতে লাগল তার চোখ। থ্রিপিসের মুখের দিকে চাইতেই একটা বিট মিস করল রোমান। ত্রপা, তার ত্রপা। ফেসবুকে যেমনটি দেখেছে, তার চেয়েও সুন্দর! চিনতে এতটুকু অসুবিধা হল না।

কী বলবে বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। সাথে মেয়েটাও দাঁড়াল।

ত্রপার চোখের দিকে রোমান বেশিক্ষণ তাকাতে পারল না। চোখ নামিয়ে নিল।

ত্রপা একটু ঝাঁঝ দেখিয়ে বলল, এই মেয়েটাই সেই মেয়ে?

রোমান মাথা নাড়িয়ে বলল, আ-হ্যাঁ!

এ্যই মেয়ে, তোমার নাম কী? আর ওর সঙ্গে তোমার কিসের সম্পর্ক, কতদিনের সম্পর্ক, হা?

মেয়েটা আচমকা হেসে উঠল। দম ফাটানো হাসি। হাসতে হাসতেই বলল, আপু, হইচে, অনেক হইচে। আর পারছি না। এবার বেচারাকে একটু স্বস্তি দে! আমি বাসায় গেলাম। বাপরে, সেই সকাল থেকে স্টেশনে গিয়ে বসে আছি। ট্রেন পাক্কা এক ঘণ্টা লেট। তবে, গলা পরিষ্কার করতে করতে বলল, স্টেশনের অত ভিড়েও তোর লোকটাকে চিনতে কষ্ট হয়নি একটুও!

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]