আমাদের রাসেল নতুন একটি ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছে। ব্যবসাটা মন্দ নয়। লোকের কাছে সম্মানও পাওয়া যাবে, আবার তার সাহিত্যের খোরাকটাও মিটবে। তাই আগে পিছে না ভেবে সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদটাতে সে আহরণ করলো।

ছোটবেলা থেকে নয় বরং যখন সে মাধ্যমিকের শেষধাপে তখন থেকে সাহিত্যের এই নেশাটা তাকে জাপটে ধরেছে। কোনো প্রকারেই তার এই ঘোরের মধ্য থেকে বেরুবার কোনো উপায়ান্ত না দেখে শেষমেশ নিজেকে সাহিত্যের রস উৎঘাটনে নিবৃত্ত করল। সুতরাং আগ পিছ না ভেবে নিজেকে বড় না হলেও এক প্রকারের লেখক মনে করে মনে মনে সে গর্ব অনুভব করতে লাগল। তাই নিয়মিত সাহিত্যপত্রগুলো সংগ্রহ করা যেমন তার প্রতিদিনের রুটিন মাফিক কাজ হয়ে দাঁড়াল তেমনি নন্দিত নরকে, দিপু নম্বর টু, বন্দি শিবির থেকে, তোমাকে অভিবাদ হে প্রিয়তমাসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় বইগুলোর সমালোচনায় আত্মনিবেদন করল। তার মতে সাহিত্যের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সমালোচনা সাহিত্য। সাহিত্যের প্রকৃত রস উৎঘাটনের জন্য সমালোচনা ছাড়া কোনো উপায় নেই। মাঝে মাঝে দু একটি পত্রিকায় দেখতাম গুরুত্ব দিয়েই তার সমালোচনা ছাপানো হতো।

আমাদের এই সাহিত্যিকের মাথায় হঠাৎ একটি নেশা চেপে বসেছে। সাহিত্যপত্র প্রকাশ করা। সাহিত্যপত্র ছাপানোর পিছনে সব থেকে যে বিষয়টি বেশি কাজ করেছে সেটি হলো তার নিজের লেখা ছাপানো। আর যা-ই হোক না কেন নিজের পত্রিকায় নিজের লেখা ইচ্ছা মতো ছাপানো যাবে। তাতে তার লেখা, সমালোচনা সবই সহজে পাঠকের হস্তগত হবে। তাতে কারো করো উজর অজুহাত চলবে কেন! অন্যসব পত্রিকার সম্পাদকেরা একঘেয়ে, তাদের সাথে যাদের গুড রিলেশন কেবল তাদের লেখাই সুন্দর করে ছাপানো হয়। আরও যে গাদা গাদা লেখা সম্পাদকের টেবিলে-ইমেইলে পড়ে থাকে, সম্পাদকেরা তার দিকে ভুলেও দৃষ্টিপাত করেন না। এ নিয়ে রাসেলের আবার একটা বক্তব্যও আছে— তাহলে সমাজে ভালো লেখক জন্মাবে কীভাবে বলুন, ধীরে ধীরে অনুপ্রেরণা না পেয়ে তো তারা গোল্লায় যাবেই! তাই আজকের এই সুমতি। আমার পত্রিকায় আমি সবার স্থান সমানভাবে দেখবো, যাদের লেখা ভালো, তাদের গুরুত্ব দেওয়া হবে, যাদের লেখার মান অটতা ভালো না, তাদের গুরুত্ব কম হবে।

বেশ কয়েকটা সংখ্যা প্রকাশ হলো, চারিদিকে সম্পাদক হিসাবে তার একটা প্রশংসাও ভেসে আসতে শোনা যাচ্ছে। নিজের প্রশংসা ভালো লাগে না জগতে এমন বিজ্ঞজন কজন আছে! নিজের প্রশংসায় আকৃষ্ট হয়ে সম্পাদক সাহেব পত্রিকার দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিলেন। ধীরে ধীরে সাহিত্যপত্রের পরিধিও বেড়ে গেল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তার সাহিত্যপত্রে লেখা ছাপানোর জন্য ডাকযোগে, কুরিয়ারযোগে, ই-মেইলে গাদা গাদা লেখা আসতে শুরু করল। একদিন তো রাসেল অবাক, ভারত থেকে লেখা এসেছে তার পত্রিকায় ছাপানোর জন্য! সে লেখাটা বার কয়েক পড়ল, যদিও মানের দিক থেকে এবং উপমা প্রয়োগের দিক থেকে লেখাটি ঠিক একটা উন্নতমানের হয়ে উঠতে পারেনি, তারপরও ভারত থেকে এসেছে সুতরাং ছাপানোটা সে যুক্তিসংগতই মনে করল।

(দুই)

এদিকে তার বালিকাবধু যে ধীরে ধীরে যৌবনে পদার্পণ করেছে তার খোঁজ মনে হয় রাসেলের জানা শোনার বাইরেই থাকল। বাড়িতে আরশির বড় একা একা লাগে। সময় কাটানোর মতো সময় বলতে টেলিভিশন দেখেই প্রথম প্রথম পার করত। কিন্তু যখন যৌবনে আহরণ করেছে তখন যেন শুধু টেলিভিশন তার একাকীত্ব দূর করতে পারছে না, কিছু একটা জিনিসের বড় অভাব অনুভব করে। সারাদিন মন মরা হয়ে বসে থাকে। শহরের চাঞ্চল্যকর রাস্তাঘাট সে তেমন চেনে না, সুতরাং গৃহবন্দি অবস্থায় একমাত্র মুক্তি।

রাসেলের সংসারে মাত্র দুই জন সদস্য। তাই আরশির যেমন কোনো কাজ কর্ম ছিল না, তেমন ঘরে বইয়েরও অভাব ছিল না। বই পড়ার বড় নেশা না থাকলেও স্বামীর অনুপ্রেরণায় সে মাঝে মাঝে বই পড়ত। তাই সখের বসে পড়াটা ধীরে ধীরে চাহিদায় পরিণত হলো। এখন এই একাকীত্বকে দূর করার জন্যই হোক আর সম্পাদক স্বামীর ভালোবাসা আর একটু বেশি পাবার জন্যই হোক সে ইদানিং বই পড়াতে ব্যাপক মনোনিবেশ করেছে। ইতোমধ্যে মেঘনাদবধ কাব্য, গোরা, শকুন্তলা, ওয়্যার এন্ড পিচ, পথের প্যাচালী, শ্রীকান্তের মতো বইগুলো সে রপ্ত করে ফেলেছে। যেন স্বামীর থেকেও এখন তার এইটাই সব থেকে বড় নিঃসঙ্গতার অনুসঙ্গ হয়ে দাঁড়াল। আর এরই দৌলতে দুই এক লাইন লিখতেও শুরু করল।

মাঝে মাধ্যে পাশের ফ্লাটের ভদ্র মহিলা আরশির সাথে সময় কাটাতে আসে। তারও বেচারি আরশির মতো অবস্থা। স্বামী ব্যবসার কাছে প্রায়ই বাইরে থাকে। প্রথম প্রথম আরশি তার জন্য অপেক্ষা করত, এখন প্রায় অসহ্যই মনে হয়।

সেদিন আরশি ‘পল্লীসমাজ’ পড়ছিল। হঠাৎ-ই কলিংবেলের শব্দ শুনে তার ভেতরে একটা বিরক্তিবোধ অনুভূত হলো। এসময় কেউ ডিসটার্ব করতে আসে! বিরক্তিমাখা মুখে গিয়ে দরজাটা খুলে দেখে পাশের ফ্লাটের সেই ভাবি। তিনি একটু মুচকি হাসতে হাসতে ভিতরে ঢুকে সোফাই গিয়ে বসলেন– তা এই ভর দুপুরে কী করছিলে আরশি?

আরশি। কিছুই না, শরীরটা ভালো না একটু শুয়ে ছিলাম।

ভাবি। তাহলে আমি এসে তোমাকে বিরক্ত করলাম বুঝি!

আরশি। না, না, তা হবে কেন? বরং ভালোই করেছেন।

ভাবি। না, ওই যে, বললে তোমার শরীরটা খুব একটা ভালো না, তাই বলছিলাম আর কি!

এমন সময় আবার কলিংবেলের শব্দ। আরশি বুঝতে পারল রাসেল এসেছে। তাই ভাবির দিকে লক্ষ করে বলল, ভাবি, আপনার ভাই এলো মনে হয়!

রাসেল ভেতরে এসে আরশির কাছে এক গ্লাস পানি চেল। গ্লাসভর্তি পানি নিয়ে এসে রাসেলের হাতে দিয়ে আরশি একটু করুণ সুরেই বলল, “এভাবে পত্রিকার পিছনে পড়ে থেকে শরীরটা যে একেবারে শুকিয়ে যাচ্ছে সে খেয়াল কি রাখ? বলি— একটু সংসারের দিকেও মন দাও।”

রাসেল পানির গ্লাসটা রেখে আরশির দিকে একটু মুখ ফিরিয়ে মুচকি হাসল, ভাবলো, তাইতো, বেচারা আরশি একা ঘরে থাকে, তাকে অনুসঙ্গ দেওয়ার মতো কেউই তো নেই। একটু পরে বলল, “বলো, সংসারের জন্য কী করতে হবে? আমি প্রস্তুত।”

আরশি মুখ বাঁকা করে ব্যজ্ঞ করে বলল, “আর প্রস্তুত, এমন প্রস্তুত শতকালেও দেখিনি, যে প্রস্তুত দু দিন পরে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, তার মানে কি?”

রাসেল হাসিমুখে আরশির কোমর ধরে টেনে কাছে এনে কানে কানে বলল, “প্রতিজ্ঞা করছি, এবার আমার সুন্দরী পত্নী যা যা বলবে তাই আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করব, এই কান ধরছি, নাক ধরছি।”

আরশি হাসি সংবরণ করতে পারল না। লজ্জাতুর হাসি হেসে বলল, “থাক বাবা, আর কান-মুখ ধরতে হবে না, আপাতত, গোসল টা সেরে আস। আর শোন, আমার জন্য তোমার সাময়িকী একটা করে এনে দেবে?”

রাসেল বলল, “বললাম তো, আমার সুন্দরী স্ত্রী যা চাইবে, আমি এখন থেকে তাই করব।”

(তিন)

রাসেল পত্রিকা নিয়ে আরও অধিক ব্যস্ত সময় পার করতে লাগল। সম্পাদক হিসাবে এখন সে নামকরা সম্পাদকদের মধ্যে একজন, সম্মানও যথেষ্ট পেয়েছে। শুধু নিজের লেখা ছাপানোর উদ্দেশ্যে সাহিত্য সাময়িকী যাত্রা শুরু করলেও তার মেধা ও মননের সম্বনয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাপানোর উপযুক্ত লেখা এসে তার টেবিলে হাজির হয়। পুরাতন লেখকদের তুলনায় সে নতুন লেখকদের গুরুত্ব বেশি দেয়। কেননা, যারা পুরাতন তারা তো নিজেদেরকে মেলে ধরতে পেরেছেনই, কিন্তু যারা নতুন, তাদের তো প্রকাশ করার দায়িত্ব রাসেলের মতো সম্পাদকদেরই। তাই তার ব্যস্ততারও কমতি নেই।

সম্পাদক হিসেবে রাসেল আদর্শবান একজন ছিলেন। নতুন লেখকদের লেখা সে না পড়ে ছাপত না। বেশ কয়েকজন নতুন লেখকের লেখা পড়তে পড়তে একজন নতুন লেখিকার লেখা তার মনে দাগ কেটে গেল। ছোট একটি নাম। সাথে অব্যয় কিংবা কোন বিশেষণ নাই, শুধুই কণিকা।

রাসেল তো খুবই অবাক, নতুনরাও এরকম লেখতে পারে! লেখাটি যদিও খুব একটা ছোট নয়, তারপর সম্পাদক সাহেব তা পড়ে ফেলল। লেখাটার শুরুর দিকটা ছিল এরকম—

আমাদের সাহিত্য নিয়ে আমি আশাবাদী। আমাদের পূর্বের ইতিহাস থেকেই আমার এ আশার সঞ্চারণ। আমাদের চর্যাপদ আছে, আমাদের ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী আছে, আমাদের কৃষ্ণকুমারী আছে, আমাদের কপালকুণ্ডুলার মতো সাহিত্য আছে। সুতরাং আমার মতো আমাদের সকলেরই আশাবাদী হওয়া উচিত। কিন্তু এখনকার সাহিত্য নিয়ে আমি মোটেই আশাবাদী নই। সাহিত্যের নামবিচারে পূর্বের তুলনায় এখনকার সাহিত্য মোটেই তার সমকক্ষের নয়, তবু আমি উচ্চকণ্ঠে বলতে পরি, এটাও আমার, আমাদের সাহিত্য। তবে, এখনকার লেখকদের আমি একটাই অনুরোধ করতে চাই— কখনো শিকড়চূত্য হয়ো না, তা হলে আমাদের সাহিত্যের আশার দুয়ার চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।
রাসেল ভাবলো— তাইতো, আমি একজন স্বনামধন্য সম্পাদক— কিন্তু আমার মাথায় তো এতো বড় কথাটি আসেনি! নিশ্চয় এই লেখিকাকে সমাদর করলে সে সাহিত্যের গড়াদর করবে না; এই নবলেখিকার মেধা প্রকাশ করলে সাহিত্যের মঙ্গল ব্যতীত অমঙ্গলের আশংকা নেই।
রাসেলের সাহিত্য সাময়িকীর প্রতিটি সংখ্যায় কণিকার একটি করে প্রবন্ধ ধারাবাহিকভাকে প্রকাশ হতে থাকল। সচারচর প্রবন্ধের বিষয় সাহিত্য, সমাজ ও ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রতিটি প্রবন্ধই তার নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। কোনোটির সাথে কোনোটির অক্ষরিক বা বৈশিষ্টগত মিল নেই।

রাসেলের সাহিত্য সাময়িকী বেশ প্রভাব বিস্তার করছে তরুণদের মধ্যে। এর পেছনে শুধুমাত্র কণিকার ভূমিকা অপরিসীম তা বলবা না, বরং সাময়িকীতে যেসকল নতুন নতুন লেখকদের লেখা ছাপানো হচ্ছে তাদের প্রত্যেকেরই লেখার মান নিয়ে দ্বিমত করার কোনো কারণ নেই। রাসেল কণিকার পরামর্শ মতো নবীন লেখকদের প্রাধান্য দেয়। তাদের লেখার মান নিয়ে সে নিজেও আত্মবিশ্বাসী এরা একদিন সাহিত্যের বিপ্লব ঘটনে। বিশেষ করে কণিকার বড় সড় পাঠক হয়ে উঠেছে সে নিজেই, আর অন্যদের কথা তো পড়েই থাকল। মনে মনে রাসেল কণিকাকে অনেক রিসপেক্টও করে— একজন তরুণীর মাথায় এতোগুলো বুদ্ধি থাকতে পারে তা কণিকার লেখা না পড়লে সে বুঝতেও পারত না।

রাসেল প্রতি সংখ্যায় লেখার জন্য এক কপি পত্রিকার সাথে কণিকাকে সম্মানীও নিয়মিত পাঠাতে শুরু করল। ওদিক থেকেও কণিকা নিয়মিত রাসেলের পত্রিকার জন্য লেখা পাঠিয়েই চলেছে। সম্পাদক এবং লেখকের যে প্রকার গুড রিলেশন হওয়া জরুরী এদের দেখলে অন্য সকল লেখক এবং সম্পাদকরা ঠিক তা অনুভব করতে পারবেন, এটা হলফ করে বলতে পারি।

কণিকা আধুনিক যুগের মেয়ে ফেসবুক, ই-মেইল সবই তার দখলে। যদিও ফেসবুকে অযথা সময় অপচয় করে না। খুব একটা দরকার না হলে সে অনলাইনে আসেও না। যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু সময় অতিবাহিত করে আবার অফলাইনে চলে যায়। যার ফলে রাসেল তার সাথে যোগাযোগ করতেও পারে না। কিন্তু তার অনেক দিনের ইচ্ছা লেখিকাকে ডেকে একদিন চা খাওয়ানো।

রাসেল নিজের একান্ত ইচ্ছা একদিন কণিকাকে অনলাইনে পেয়ে প্রকাশই করে ফেলল—

রাসেল।স্বনামধন্য লেখিকা কণিকা, প্রথমেই আমার কদমবুচি নিবেন।

কণিকা। নিলাম।

রাসেল। বহুদিন ধরে ভাবছি আমার একটা একান্ত ইচ্ছা পূরণ করব। কিন্তু আপনার সাথে যোগাযোগের অভাবে তা আর হয়ে ওঠে না।

কণিকা। আমি তো এখন অনলাইনে আছি, বলে ফেলুন কী বলতে চান, আমি শুনতে প্রস্তুত আছি।

রাসেল। আপনাকে একদিন ডেকে চা পান করানোর ইচ্ছা আমার অনেক দিনের। একদিন আসবেন সময় করে?

কণিকা। না, সে তো আমি পারব না। আমার হাতে এখন অনেক কাজ। এখনতো আমি আপনার চা পানের দাওয়াত নিতে পারছি না, কিছু মনে করবেন না, আমি আসলেই সরি।

রাসেল। না, না, আমি ঠিক এখন বলছি না, আপনার যখন সময় হয়, না হয় তখনই আসলেন।

কণিকা। লেখার অনেক চাপ, সম্পদকেরা লেখার জন্য অনেক তাগিদ দিচ্ছে। তাছাড়া আমার তো সংসার আছে, আমি ইচ্ছে করলেও বাইরে যাবার সময় পাই কই?

রাসেল। তবুও যদি পারেন— আসলে খুশি হব।

কণিকা। ধন্যবাদ, আমি চেষ্টা করব। তবে যে আসবোই তা কিন্তু কথা দিতে পারছি না।


(চার)

আরশি, বেচারা বাসায় একাই থাকে। রাসেল অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে। আজ হঠাৎ-ই সে সময়ের আগে বাড়ি ফিরে এসেছে। তার বিমর্ষ মুখ দেখে কাছে গামছাটা নিয়ে এগিয়ে গেল আরশি— কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে, তোমার?

রাসেল বিছানায় বসে আরশির দিকে মুখ ফিরিয়ে একটু মুচকি হেসে বলল, “না, তেমন কিছু না। সারাদিন পরিশ্রম করে একটু টায়ার্ড লাগছে।”

আরশি। মাথা টিপে দেবো? ভালো লাগবে।

রাসেল। না, দরকার নেই।

আরশি। তাহলে ফ্রেশ হয়ে আস, আমি খাবার রেডি করে করছি।

রাসেল আরশির মাজা ধরে মৃদু টান দিয়ে পাশে বসাল। তারপর আরশির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা, তুমি যদি লেখক হতে, তাহলে কেমন হতো?”

আরশির চোখে মুখের উৎকণ্ঠিত আবেগ মাখানো লজ্জা সে শাড়ির আঁচল দিয়ে নিবারণ করতে চেষ্টা করে বলল, “থাক, তার আর দরকার নেই। লেখক স্বামীর জ্বালাই সহ্য করতে পারছি না, আর যদি পুরো পরিবার লেখক হই তাহলে তো সংসার উচ্ছন্নে যাবে।”

রাসেল আবেগজড়ানো কণ্ঠে বলল, “না গো না, সবই পারবে— যে রাধে, সে চুলও বাঁধে।”

আরশি। থাক, আর ভণিতা করতে হবে না, কাজ নেই আমার লেখক হয়ে। তুমি লেখক আছো, তুমিই থাকো। ওতে আমার কোনো ইচ্ছা নেই। যাও তো ফ্রেশ হয়ে এসো।

রাসেল বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে এসে খেতে বসল। আরশি তার পাশে দাড়িয়ে থেকে খাবার তুলে দিতে দিতে বলল, আচ্ছা, আমি যদি সত্যিই লেখিকা হতাম, তাহলে তুমি কী করতে?

রাসেল আরশির মুখের দিতে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল। তারপর আবার খাবারের দিতে তাকিয়ে খাবার খেতে খেতে বলল, একজন লেখক চায়— তার স্ত্রী লেখক না হোক, অন্ততপক্ষে যেন ভালো একজন পাঠক হয়। আর তুমি সেটা আছ। আমি লেখক হিসাবে গর্বিত যে, আমার স্ত্রী একজন ভালো পাঠক। কিন্তু আমি যখন সম্পাদক, তখন ঠিক একইভাবে আশাবাদী আমার স্ত্রী যেন একজন লেখিকা হয়। আর একজন সম্পাদক স্বামী হিসাবে ঠিক ততটাই খুশি হতাম, যতটা লেখক স্বামী হিসাবে খুশি।

আরশি। যদি বলি— আমি লেখক। তাহলে?

রাসেল বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে, কীভাবে?

আরশি। হুম, আমি যেমন লেখক স্বামীর আরশি, ঠিক তেমনি সম্পাদক স্বামীর কণিকা।

রাসেল। কণিকা!

আরশি। হুম কণিকা।

আমি লক্ষ করলাম— তাদের দুজনের দৃষ্টিপাত এক হয়ে গেল।

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]