আকাশে বাজছে ঘন্টা।

নীলা নামের মেয়েটিকে ফ্রেমে আনো দেখি। প্রথমে ওর মুখের ক্লোজ। গাড়ির ভেতর দিয়ে। চলন্ত গাড়ি। ও বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। রাস্তাঘাটের দৃশ্য দেখছে। ভাগ্য ভালো এখনো পর্যন্ত জ্যামে পড়তে হয়নি। সকাল সাড়ে দশটা। মানুষজন অফিস-স্কুলের ভেতর এতক্ষণে সেঁধিয়ে গেছে বলে জ্যাম জমেনি কোথাও। জমতে জমতে দুপুর, পুরোপুরি জমজমাট হবে আবার স্কুল-টিস্কুল অফিস-টফিস ছুটি-টুটি হওয়ার সময়।

বাতাস বইছে একই ভাবে। সকালের বাতাস। ফেব্রুয়ারির সকাল বলে শীত এখনো পুরোপুরি চলে যায়নি, তার আঁচ টের পাওয়া যাচ্ছে। আদর আদর হিম হঠাৎ হঠাৎ মনটাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে ভালবাসা মাখিয়ে।

সানগ্লাসটা মাথার উপরে ঘুমাচ্ছে আপাততঃ। চোখে-মুখে চুল উড়ে এসে পড়ছে। কেমন আনমনা হয়ে আছে মেয়েটা। চুল সরিয়ে নেওয়ার খেয়াল নেই। থাক্, এভাবেই থাক্। বেশ তো লাগছে এলোমেলো নীলাকে। এবার জুম আউট করো তো। নীলার বেশভুষার অবস্থাটা দেখি।

নীল-ছাই রঙা জিন্স, উপরে গোলাপী ফতুয়া। গলার পেছন দিয়ে সামনে এনে ফেলে রাখা কোঁচকানো টাইপের সুতির ওড়না। ঘুম থেকে উঠেছে পৌনে দশটায়। তাড়াতাড়ি রেডি হতে হয়েছে। ওড়না ইস্ত্রি করার দরকার ছিল হান্ড্রেড পারসেন্ট। সময় নেই। অগত্যা এটাকেই স্টাইল বলে চালিয়ে দিতে হবে। তারপরও ক্লাস মিস্। দশটায় শুরু হওয়ার কথা, এখন তো সাড়ে দশটা। এখনো ইউনিভার্সিটি এরিয়ায় ঢুকতে পারেনি।

জুম আউট হচ্ছে তো হচ্ছেই। এই যাহ্, ভ্যাবলা শাহাবুদ্দিন যে ফ্রেমে এসে পড়ল। পুরো কম্পিজিশনের অবস্থা এখন ছ্যাড়াব্যাড়া। কোথায় এলোমেলো নীলাকে দেখব, তা না শাহাবুদ্দিনকে……! ব্যাটাকে ফ্রেম আউট করতে গিয়ে থমকে যেতে হয়। ভুরু কুঁচকে কেমন অদ্ভুতুড়ে ভঙ্গিতে সামনের লুকিং গ্লাসের ভেতর দিয়ে নীলার দিকে তাকিয়েছে লোকটা। রাস্তার দিকে তাকায় আবার গ্লাসের ভেতর, আবার রাস্তায়। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে, সর্বনাশ ম্যাডাম, সর্বনাশ ! জানলার কাঁচ উঠায়ে দ্যান।

নীলা রেগে গেছে দেখা যাচ্ছে। লুকিং গ্লাসের ভেতর দিয়ে রাগী রাগী চোখে তাকায় শাহাবুদ্দিনের দিকে। কিছু বলে না যদিও। শাহাবুদ্দিন ভয় পেয়েছে। ওর সাথে সাথে দেখছি গাড়িটাও ভয় পেয়ে গেছে। গতি কমে যাচ্ছে। নীলা প্রশ্ন করে, হয়েছেটা কি?

সা…সাম…নে…এ…!

সামনে কী?

নীলা জানালা দিয়ে মাথা বের করতে চায়। শাহাবুদ্দিন প্রায় কান্নাকাটি শুরু করে দেয় ওর কান্ড দেখে। বলে, ম্যাডাম, জানলার কাঁচ উঠায়া দ্যান। বিপদ হইব। ঘটনাটা কী?

সামনে…সামনে…

সামনে কী? গাছ কেটে ফেলে রেখেছে কেউ? আজকে তো হরতাল না। তাহলে এসব হবে কেন?

না ম্যাডাম, গাছ-টাছ না। হরতালও না।

তাহলে?

ও আবার মাথা বের করতে চায় দেখে শাহাবুদ্দিন তোতলাতে তোতলাতে তড়বড় করে আসল ঘটনাটা বলতে শুরু করে। হিরো বিলু…ওরফে মাস্তান বিলায়েত দলবলসহ সামনে রাস্তাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের পাশ কাটিয়ে যাওয়া যাবে না। পুরো রাস্তা জুড়ে ওরা। গাড়ি কি তাইলে ফুটপাতে উঠায়ে দেব?

নীলা যদি হুকুম করে তাহলে শাহাবুদ্দিন সেটাও পারবে। গাড়ি চালাতে বেজায় এক্সপার্ট। কিন্তু আর সব কাজে একদম নাদান।

নীলা জানালা দিয়ে মাথা বের করে দেখে, সিনেম্যাটিক স্টাইলে হিরো বিলু হাতে ইয়া বড় এক হার্ট আকারের গোলাপী বেলুন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবখানা এমন, এক্ষুণি র‍্যাম্পে উঠবে, ক্যাটওয়াক করে ফ্যাশন শো করবে। দারুণ হাসি পাচ্ছে নীলার। মাস্তানি করতে করতে পড়ালেখাটা চাঙে উঠেছে ছেলেটার। কত বছর ধরে ইউনিভার্সিটিতে আছে, তা নাকি টিচাররাও ভুলে গেছে। চেহারা-সুরত মন্দ নয়, সেটা নিয়ে সে নিজেও গর্বিত। চ্যালা-চামচারা তো ফোলায় হিরো হিরো বলে। মাস্তান বিলু হয়ে গেছে হিরো বিলু।

শাহাবুদ্দিন কঁকিয়ে ওঠে, ম্যাডাম! আপনি নাইমেন না। সাহেব পই পই করে বলে দিছেন, আপনারে য্যান সোজ্জা কিলাসে বসাই দিয়া আসি। মাঝ রাস্তায় হ্যাপা ঘটাইয়েন না।

নীলা ওসব কথা কানে তুললে তো!

পুরো ফ্রেমজুড়ে এখন শুধু নীলা। গাড়ির দরজা খুলে পা রাখে পীচ ঢালা কাল রাস্তার উপর। টানটান শরীরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সানগ্লাসটা নামিয়ে আনে, ঢেকে দেয় দু’চোখ। কয়েক সেকেন্ড ক্লোজ করা যায় শ্যামলা সুন্দর তরতাজা মুখখানাকে। কয়েক সেকেন্ড। ব্যস, এইবার ওর পেছন দিকে চলে এস, তাকাও…লুক থ্রো করো সামনের দিকে। দ্যাখ ওখানে কি ঘটছে।

পুরো স্ক্রিনে বিলু ও বিলুর বন্ধুরা। ক্লোজ টু বিলু। লালটুস্ টুস্ টুস্ মুখখানা। জেলি মাখা চুল পেছনে ঝুটি করা। ঠোঁটের কোণায় জ্বলন্ত সিগারেট কায়দা করে ধরা। সিগারেটের পাছাটা লাল টকটকে। বিলু অক্ষয় কুমারের স্টাইলে স্বগতোক্তির মতো করে বলে, মাই বেইব। উম্ম্….মা ! সত্যিই ও মুগ্ধ। ওর চোখে মুখে চমৎকার মুগ্ধতা।

আবার দেখা যাক্ নীলাকে। হেঁটে আসছে। সকালের আলোয় মেয়েটাকে সাক্ষাৎ কারিনা কাপুর লাগছে। কী স্মার্ট, কী সুন্দর যে দেখতে ! বিলুর মতো শক্তপোক্ত ছেলে কি খামোখা পাগল হয়েছে !

বিলুর ইচ্ছে করছে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়ে। বেলুনটাকে বাড়িয়ে দিয়ে গান গেয়ে ওঠে। কী গান..কী গান…ধুর ছাই, এই মুহূর্তে কেন যে কোন গান মনে আসছে না ! গান মনে করার উত্তেজনায় বিলুর হার্টবিট আরো বেড়ে যায়। শেষমেশ এত দিন ধরে প্ল্যান করা এই রোমান্টিক মুহূর্ত যদি বানচাল হয়ে যায়, এই ভয়ে প্রাণপনে শান্ত থাকার চেষ্টা করে বিলু। কাইলা মতিন ওর পিঠে আলতো হাত রেখে বিড়বিড় করে বলে, কুল ডাউন ম্যান।

কুল ডাউন। ম্যান। ইয়েস ম্যান। অফকোর্স ম্যান। হান্ড্রেড পারসেন্ট ম্যান। ম্যানলি ম্যান। ম্যাচো ম্যান।…বিলু নিজেকে সাহস দেয় আর দম নেয় জোরে। ইস্, এক গ্লাস পানি খাওয়া যেত!

নীলা ওদের কাছাকাছি চলে এসেছে। কৌতূহলী ভঙ্গিতে দেখছে বিলুকে। বিলুর হাতের বেলুনটাকে। বিলুটার হাঁটুর কাছে ছেঁড়া ইট রঙের জিনসের প্যান্ট, গায়ে বেশির ভাগ বোতাম খুলে রাখা টকটকে হলুদ সিল্কের শার্ট। ফাঁক দিয়ে লোমবহুল বুকের পেশি দেখা যাচ্ছে। চিড়িয়া বটে!
বিলুর ঠোঁটের কোণায় জ্বলন্ত সিগারেট। প্রায় নিঃশেষ। ওটার তাপ লাগছে। এ্যাতো দ্রুত পুড়ে গেল শালা! যাকগে, ঐ জ্বালা পাত্তা দেওয়া যাবে না। ওসব সহ্য করে বলতে হবে…বলতে হবে…হ্যাপ্…পি ভ্যালেন্টাইনস ডেই সুইট…সুইট…
কাইলা মতিন মনে করিয়ে দেয় কানের কাছে মুখ এনে, সুইট হার্ট।

নীলা সানগ্লাস উঠিয়ে চোখ পাকিয়ে শাসায় কাইলাকে। চুপ হয়ে যায় ছেলেটা। সানগ্লাসটা আবার চোখের উপর বসিয়ে বিলুর দিকে তাকিয়ে বাচ্চাদের স্কুলের মিস্-এর মতো মিষ্টি হাসি হেসে বলে, ডায়ালগ মুখস্ত হয়নি? তাহলে এ্যাক্টো করবে কী করে?

অরকম ভাবতাছ ক্যানো ডিয়ার? আই রিয়েলি লাইক ইউ।

কাইলা ওর দোস্তকে আবার মনে করিয়ে দিতে চেয়েছিল, লাইক ইউ নয়, বলতে হবে লাভ ইউ। নীলার চোখের ধমক খেতে হবে ভেবে চুপ করে গেল। নীলা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে বেলুনটাকে। তাতেই বিলুর বুকের ভেতরটা কেমন গদগদ ভাবে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। খানিক ফুর্তি নিয়ে বলে, এইটা তোমার জন্য। ফর ইউ, অনলি ইউ।

থ্যাঙ্কস্।

নীলা দু’হাত দিয়ে বেলুনের দু’পাশে হঠাৎ চাপ দিয়ে বসে জোরে। ধাম্ করে ফেটে যায় বেচারা। বন্দী গ্যাসটুকু ছড়িয়ে পড়ে সকালের বাতাসে।

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে ওরা সব্বাই। তবে বিলু ছেলেটা সাথে আরো কিছু খেয়েছে। কষ্ট, অপমান, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ইত্যাদি ইত্যাদি। ফাটা বেলুনের মতো ফুস্ হয়ে যাবে না কি নীলাকে নিয়ে গড়ে তোলা স্বপ্নসাধ? মনে মনে ভেবেছে, নীলাকে ডাকবে নীলাঞ্জনা বলে। নচিকেতার মতো গাইবে, নীলাঞ্জনা….বুক কেটে দ্যাখ, দেখবে সেথায় এক কিশোরের মুখ না চোখ না কি যেন…ধুর্ ! গানটাও এলোমেলো হয়ে গেল।

বিলুর বন্ধুরাও অপমানিত বোধ করছে। বসের অপমান মানে ওদেরও অপমান। দোকানে দোকানে গিয়ে বিলুর নাম বললেই ক্যাশবাক্স খুলে যায়, আর সেই বিলু ওস্তাদকে কি না এমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা ! বন্ধুদের পক্ষ থেকে কাইলা মুখ খোলে। রাগের সাথে ঝাড়ি মিশিয়ে বলে, বিলু ভাই কিসে কম?

নীলা কাইলার দিকে তাকিয়ে কারিনা মার্কা মধুর তীর ছুঁড়ে বলে, তোমার চেয়ে তো বেশি নয়।

কাইলা ঢোক গেলে। আর বিলু চোখ বন্ধ করে ফেলে কাইলার দিকে নীলা….নীলাঞ্জনা তাকিয়ে আছে সেটা দেখার কষ্ট সইতে পারবে না বলে। টাইব্রেকার চলছে। ক্লোজ টু গোলপোস্ট। কে গোল করতে পারবে? কাইলা না বিলু? বিলু না কাইলা? নীলার খুব হাসি পাচ্ছে দু’টোর কান্ড দেখে। যদিও ততক্ষণে নতুন রেফারির বাঁশি বেজে উঠেছে। ঢ্যাঙ্গা বাবু বুঝে ফেলেছে ঘটনাটা। এই মেয়ে চাল্লু খুব। ওস্তাদকেও ঘোল খাইয়ে দিচ্ছে। নীলাকে ঝাড়ি মেরে বলে, ঘিরিঙ্গি কইরেন না, বিলু ভাই কিন্তুক ভাইঙ্গা ফালাইতে ওস্তাদ।

আমি ভাঙ্গব, তবু মচকাব না। সানগ্লাসটা চোখ থেকে সামান্য উপরে উঠিয়ে বিলুকে দেখে। তারপর আবার ঠিক মতো বসিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়। বিলু খপ্ করে ধরে নীলার হাত। আপাততঃ ওর কবজির শক্তি টের পাওয়াবে ও।

নীলা ব্যথা পেয়ে উফ্ করে ওঠে। বলে, করছটা কী? মচকে যাবে তো !

দেখতাছি, মচকানো যায় কি না।

মচকালে মচকাবো। মচকে মচকে মচমচে হয়ে যাব। তবুও তুই আমার মন পাবি না শয়তান।

হঠাৎ-ই বিলুর কী যেন হয়। নীলার হাতটা ছেড়ে দিয়ে অন্য দিকে মুখ করে দাঁড়ায় মন খারাপ করে। অন্য সব মেয়েদের সাথে কত কী হয়েছে, কত রকমের কত কিছু। এরপর তারা ওকে ছেড়ে চলে গেছে, নয়তো ও তাদের ছেড়ে চলে এসেছে। কই, কখনো তো মন খারাপ হয়নি। এই মেয়েটার বেলায়…এই মেয়েটা….মেয়েটাকে সত্যিই ওর নীলাঞ্জনা বানাতে ইচ্ছে হয়েছিল। বিলু ওর পজিশন ভুলে সাগরেদদের সামনেই মুখটা কালো করে রাখে। কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না। কাইলা মতিন বিলুর হাতের উপর সান্ত্বনার পরশ বুলিয়ে বলে, ওস্তাদ। সেন্টু খাইয়েন না। ঢ্যাঙ্গা বাবু খরখরে গলায় বলে, সেন্টু খাওনের কী হইল?

কাইলা নিজেও কেন যেন কষ্ট পেয়েছে। ঢ্যাঙ্গাকে এক ধমক মেরে বলে, তুই থাম্। দ্যাখছস্ না ওস্তাদের মন খারাপ?

ঢ্যাঙ্গা ওস্তাদকে মোক্ষম সান্তনাটা দিতে চায়। বলে, ওস্তাদ বাদ দ্যান তো। ব্যাপারটারে প্র্যাকটিস বইলা ভাবেন।

প্র্যাকটিস?

হু। প্র্যাকটিস ফর দা নেক্সটো টাইম। এই ডায়ালগ তো আপনেই শিখাইছেন। মনে নাই? সুলতানা যখন আমারে ছ্যাকা দিল, আমি অরে ভুলতে পারতেছিলাম না, তখন আপনে এই কথা বলছিলেন। দারুণ কথা, মনডা ভাল কইরা দ্যায়। সুলতানা ফুলতানার কথা আমার এখন মনেও নাই। তারপর কত টুনি ফুনি বাবলি পলি আসল আর গ্যালো। নীলার খুব পছন্দ হয়েছে ঢ্যাঙ্গাকে। ওকে উৎসাহ জুগিয়ে বলে, ভেরি গুড। এই তো একটা কাজের কথা বললা তুমি। স্মার্ট বয়। এই রকম প্র্যাকটিস না করলে কি প্র্যাকটিক্যাল হওয়া যায়?

বিলু বেচারার এখনো মনটা খারাপ। মুখের উপর কালো মেঘ, থমথমে কালো। বৃষ্টি হবে না, শুধু গর্জন হচ্ছে নীরবে নিঃশব্দে, বিলুর লোমবহুল পেশীওয়ালা বুকের ভেতরে।

নীলা বিলুর দিকে তাকায়। নরম করে বলে, শোন বিলু। এই ভাবে হয় না।

বিলু কিরকম কষ্ট নিয়ে তাকিয়ে আছে নীলার দিকে।

সানগ্লাসের আড়ালে থাকায় নীলার চোখটা ও দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু খুব ইচ্ছে করছে দেখতে। নীলা বলছে, প্রেম এইভাবে হয় না। যার তার সাথে হয় না। হয় তার সাথে, যার সাথে হবে। সে তোমাকে দেখলে আর তুমি তাকে দেখলেই টের পাবে,…. কোথায় যেন একসাথে দু’টো ঘন্টা বেজে উঠেছে। ঘন্টা দু’টো বেজে উঠলে কী হবে জান? চুম্বকের মতো দু’জন দু’জনের কাছে ছুটে যাবে। কোনো টেকনিক লাগবে না, না ঋত্বিকের না রিয়াজের।

ছোট্ট বাচ্চাকে বোঝাচ্ছে এমন ভাবে বলে নীলা, সত্যিকারের ভালবাসার জন্য ধৈর্য্য ধরতে হয়। তাড়াহুড়া করলে বউ একখান জুটবে নীলা-ফিলা-মিলা কিন্তু রিয়েল লাভ জুটবে না। নিজেকে ঠকাবে কেন বিল্লু স্যরি বিলু?

হাঁটতে শুরু করেছে নীলা। গাড়ির কাছে গিয়ে দরজা খোলার আগে আবার তাকায় বিলুর দিকে। বলে, উইশ ইউ গুড লাক মাই ফ্রেন্ড। বাই।

গাড়ির ভেতর ঢুকে গেছে নীলা। চলতে শুরু করেছে গাড়ি। অলস পাগুলোকে টেনে নিয়ে বিলু এবং বিলুর বন্ধুরা গাড়িটাকে চলে যাওয়ার জন্য পথ করে দেয়। যেন ওরা রোবট এক একজন। নীলাকে নিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে, এতে ওদের যেন আর কিছু আসে যায় না। ওরা মুখ উঁচু করে আকাশে কী যেন কি খুঁজছে। আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘগুলোর গলায় অনেকগুলো ঘন্টা বাঁধা আছে, ওরা দেখতে পাচ্ছে। এখনো বাজেনি, হয়তো বাজবে এক্ষুণি। ওরা অধীর অপেক্ষার সাথে ওদের নিজস্ব ঘন্টাগুলোর বেজে ওঠার জন্য আকাশেই তাকিয়ে থাকে। সকাল পৌনে এগারোটার রোদ ওদের গালে আদর বুলিয়ে দিচ্ছে খুব ভালবাসা মাখিয়েই। কী কোমল এখন মুখগুলো ! এই ফ্রেমটা যদি কিছুতেই ডিসলভ না হ’ত ! থাকুক না সবসময় এরকম। একে একে সবকটা মুখ। লুক ক্লোজলি। কে বলবে এই এরাই কঠিন কঠিন কথা বলে, গালি দেয়, মানুষকে আচ্ছামতো পেটায়, চান্সে মানুষজনকে মেরেও ফেলতে পারে, অথবা অফচান্সে নিজেরাই মরে যেতে পারে মানুষেরই হাতে? ক্লোজ টু স্কাই। আতিপাতি খুঁজে দেখ, মেঘেদের গলায় ঘন্টা বাঁধা আছে কি না। যদি থাকে, হাততালি দেব। হাততালির শব্দে বেজে উঠবে ঘন্টারা—টুং টাং টুং টাং। বিলুরা প্রেম খুঁজে পাবে। প্রেম খুঁজে পাবে বিলুদের। আহা, কী চমৎকার-ই না হবে ব্যাপারটা। আহা !

নীলা সয় না।

নীলা গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে থাকে। অপরাজেয় বাংলার তিন মানুষের পাথুরে পায়ের কাছে বড়সড় জটলা। জ্বালাময়ী ভাষায় ভাষণ দিচ্ছে ভবিষ্যতের ট্যাক্স ফ্রি গাড়ির এমপি, বর্তমানের পাঞ্জাবি ঝুলানো পাতি নেতা। নীলা ভাষণের ভেতর ‘জনগণ’ শব্দটার বাড়াবাড়ি রকমের উপস্থিতি টের পাচ্ছে। ইচ্ছে করছে, ও লোককে জিগ্যেস করে আসে, জনগণের ভেতর সে নিজে পড়ে কি না। না কি সে শুধুই নেতা, জনগণের নেতা কি আর নিজে জনগণ হয়? সময় নেই দেখে আপাততঃ ব্যাপারটা স্থগিত রাখলো, তবে পরে যদি কখনো নেতাটার সাথে দেখা হয়, তবে জিগ্যেস করে নেবে।

…….জনগণ……জনগণ……..জনগণ……সব ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেবে….জনগণ ষড়ন্ত্রকারীদের মুখোশ খুলে দেবে…..জনগণ রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবে…….! জনগণ এটা করবে সেটা করবে। জনগণ কী কী করবে না? নীলা অনুচ্চারিত কথাগুলোকে বাতাসে ভাসতে দেখে। জনগণ কখনোই নেতা হবে না। জনগণ কখনোই বিজয়ীর মুকুটখানা নিজের মাথায় পরতে পারবে না, ওটা নেতাদের মাথাতেই থাকবে চিরকাল। জনগণ কখনোই সমস্যামুক্ত হবে না। জনগণ কখনোই বুক ভরা তাজা নিঃশ্বাস নিয়ে খোলা মাঠে ছুটে বেড়ানোর আনন্দটা পাবে না। এই জনগণ সেই জনগণই থাকবে। জনগণ জনগণ… অলওয়েজ গনগন। যাকে গনগনে আগুনের মতো তাতানো খুব সোজা। নেতারা ইচ্ছা মতো তাতায়, তারপর নিজের ধান্দাটাকে মশাল বানিয়ে তেতে ওঠা জনগণকে রাখে মশালের আগায়। ইস্যু নামক দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে তাতানো জনগনকে আগুনে বানিয়ে দেয়। জ্বলে ওঠে জনগণ, গনগন আগুনের মতো। ব্যস্ আর কি ! নেতা সেই মশাল হাতে এগিয়ে চলে, জনগণ পুড়তে থাকে। ধান্দাবাজিটা সাকসেসফুল হলে ছাইয়ের ভেতর মশালের মাথাটা ঢুকিয়ে আপাততঃ আগুন নেভানো হয়। ধোঁয়া উঠতে থাকে যদিও। ছাইচাপা আগুন যদি এরপরও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে পানির ঝাপটা তো আছেই। … জনগণ……. জনগণ…….. জনগণ……! নেতাদের নিজের জিভটার উপর আশ্চর্যরকমের দখল। কখনোই জনগণকে তারা ভুল করে পাবলিক বলে বসে না।

নীলার হাসি পায়। এই জনগণের না খুব আত্মসম্মানবোধ ! পাবলিক বললে মাইন্ড করে। ভাবে, তাকে গালি দেওয়া হলো। ওর ঠোঁটের কোণায় মুচকি হাসি। আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে পার হয়ে যায় নেতাকে ঘিরে রাখা জনগণের জটলাকে। ওর হাসিটাকে ক্লোজ কর। আহা, মেরিলিন মনরো না কি সুচিত্রা সেন কি এরকম হাসতেন? কোনো কোনো নারীর এরকম হাসি হাজার বছরে একবার প্রত্যক্ষ করে ধরাধাম। আলো ঝলমলে সূর্য কিংবা রূপালী চাঁদ স্বাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত, শুনেই দেখুন না– এই হাসিতে মুগ্ধ হয়েছে কি না ওরা। হাসতে শিখেছে, ভালবাসতে শিখেছে হাজার বছরের সৌন্দর্য মাখানো পাগলকরা এরকম হাসি দেখে। এইমাত্র নীলা হেসেছে। আর কবে কোন্ নারী এরকম হাসতে পারবে, কে জানে !

নীলাকে জুম আউট করা যাক।

নীলার পেছন পেছন রাহাত স্যার প্রায় দৌড়ে আসছেন। মনে হচ্ছে, নীলার সমতলে না আসা পর্যন্ত তার জীবনের সার্থকতা পরীক্ষার স্থগিত ফলাফলের মতো ঝুলে থাকবে। কানে ঢুকছে নানা রকমের কথার টুকরো, ভাষণের খন্ডাংশ, হাসির ঝাপটা। একটু একটু লজ্জাও লাগছে। লজ্জাটা টের পাচ্ছেন বুকের গভীরে, দুই কানের লতিতে। কিন্তু পা দু’টো বেয়াড়া রকমের চঞ্চল গতি নিয়ে ছুটে যাচ্ছে মেয়েটার দিকে। তিনি সিম্পল লৌহখন্ড, তীব্র আকর্ষণে ছুটে যাচ্ছেন চুম্বকের গায়ের সাথে সেঁটে যাওয়ার জন্য। গায়ের সাথে সেঁটে যাওয়া….রাহাত স্যারের নাকটাও লাল হয়ে গেল ভাবতে গিয়ে। ……….গুঞ্জন, ঈর্ষান্বিত গুঞ্জনকারীরা গুঞ্জন করছে, রাহাত স্যার শুনতে পাচ্ছেন। সাউন্ড চলতে থাকুক ব্যাকগ্রাউন্ডে। বেচারা রাহাত স্যারের মুখের ভাবখানা ক্লোজ করে দেখতে থাকাটা মন্দ নয়। শালা মাস্টর, বামুন হইয়া চান্দ টাচ করবার চায়। …..চাইতাছে বইলা কিছু কইতাছি না। এটেম্পট টু টাচ হইলে কইলাম এটেম্পট টু মার্ডার হইয়া যাইব।…….বেগারের মতো ছুটছে। শেইমলেস। একটা মেয়ের জন্য নিজের পারসোনালিটি এভাবে বিকিয়ে দিতে পারি…ওহ্ নো, আমি তো ভাবতেই পারি না। আমার হাজবেন্ড যদি কখনো এমন ছ্যাবলামি করে, আমি জানিস্ আমার টো দিয়ে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেব, টাচই করতে দেব না আমাকে। অত সস্তা নাকি আমি ?………..হালার পাছায় লেজ আছে দেখছস্? পাঞ্জাবির তলায় লুকাইয়া রাখছে। যেমনে ছুটতাছে, ওইটা বাইরায়া পড়ব। ওর বউ-পুলাপান লেজ ধইরা টানে না ক্যান্ রে? খুঁটির সাথে বাইন্ধা থুইতে পারে।….লুইচ্চা। বদমাশ।……..নীলাকে বিরক্ত করছে? পুলিশ! র‍্যাব! যৌথবাহিনী!

নীলা সিঁড়িতে পা রাখছে যখন, তখন তিনি নাগাল পেলেন ওর। নীলা সানগ্লাসটা নামিয়ে রেখেছিল ভেতরে ঢোকার সময়। রাহাত স্যারের দিকে চোখ যখন পড়লো, তখন তাতে সামান্য চমকে ওঠার ভাবটা কিন্তু ঠিকই দেখা গেল। ক্লোজ করা ওর চোখ দুখানায় চমকানোর ভেতর বিরক্তি, অস্বস্তি ইত্যাদি একাকার। যদিও ওর মুখের আদলে আলগা একটা স্মাইলিং ভাব আছে বলে মনের তেঁতোটা কেউ টের পায় না। রাহাত স্যার তো সেটা টের পাওয়ার অবস্থাতেও থাকেন না কখনো। নীলাকে দেখলেই তার কী যেন কী হয়ে যায়। অন্য ক্লাসে কত ভাল পড়ান, নীলাদের ক্লাসে তা কখনোই হয় না। কথা জড়িয়ে যায়, বার বার একই প্রসঙ্গ চলে আসে…আর, সব প্রশ্নগুলো নিজের মনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেন যেন শুধু নীলাকে ছুঁড়ে দেন। অন্য ছেলেমেয়েদের চাপা হাসি কখনো কখনো জোরালো হয়ে ওঠে। শুধু নীলাকে দেখে কিছু বোঝা যায় না। ঠোঁটের কোণের হাসিটা সারাক্ষণ একই রকম। নীলা সালামটা দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। বোঝে, বোকা বোকা কোনো কথা শুনতে হবে। কী শুনতে হবে, তা-ও ও বুঝেছে। নীরা…..নীরা !

উহ্ স্যার, আমি নীলা।

হ্যাঁ হ্যাঁ…নীরা। নীরাই তো।

কিছু বলবেন?

নীরা, তুমি কাল ক্লাসে আসনি কেন? জান, তোমাকে ছাড়া আমি মোঘল হিস্ট্রির পুরোটা পড়াতে পারিনি। দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ানি খাস-এ কত কিছু হ’ত, তুমি ছাড়া ওসব আমি কিভাবে আলোচনা করব বল?

কেন স্যার? আমি ছাড়া আলোচনা করলে সমস্যা কী?

তোমার মতো এটেনটিভ স্টুডেন্ট তো ওরা নয়।

কী বলেন স্যার! আমার রেজাল্ট তো তেমন ভাল নয়। মেমোরি খুব ডাল। কিস্যু মনে রাখতে পারি না।

অসুবিধা নেই নীরা। আমি আছি না? আমি তোমার সবকিছু মনে রাখিয়ে দেব। তুমি যখনি কোথাও ঠেকে যাবে, আমার কাছ থেকে মনে করে নিও। আমি থাকতে তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। বল নীরা বল, কাল কেন আসনি?

সিঁড়ির উপরের ধাপে শাবাব দাঁড়িয়ে। থমথমে মুখে তাকিয়ে আছে এদিকে।

কাল? একটা সমস্যা ছিল।

সমস্যা? কি সমস্যা নীরা?

ইয়ে, স্যার….

পারসোনাল বুঝি ? তাহলে থাক্ নীরা। এখন শুনবো না। যখন ক্লাস অফ্ থাকে, কিংবা ক্লাসের পরে, তখন বলো।

সিঁড়ি দিয়ে নামছে শাবাব। ওর পেছনে রফিক, শাকিল আর হাবিব। মৌরিটা গেল কোথায়? নীলা মনে মনে মৌরিকে খুঁজতে থাকে। একমাত্র মৌরির সাথে পুরোপুরি আলগা ভাষায় মন উজাড় করে বকতে পারবে। আজ সকাল থেকেই যা যা কান্ড ঘটছে ! প্রথমে হিরো বিলু, এখন রাহাত স্যার। প্রথমটার চেয়ে পরেরটা কোন অংশে কম নয়।

রাহাত স্যার ক্লাস যখন অফ্ থাকে, কিংবা ক্লাসের পরে তার রুমের দরজায় ঠক্ ঠক্ শব্দ শুনতে পাচ্ছেন….অবশ্য মনে মনে। নীরা যদি আসত, দরজা খুলে যদি নীরাকে দেখা যেত! পারসোনাল সমস্যার কথা বলতে নীরা যদি তার কাছে যেত! নীলা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলে, না না স্যার। পারসোনাল হবে কেন? সমস্যাটা পারিবারিক।

তাই সেদিন আসনি?

হ্যাঁ। কি বলব স্যার, খুব জরুরী একটা ব্যাপার ছিল।

কিন্তু নীরা, তুমি যে ইম্পর্ট্যান্ট লেকচার মিস্ করে ফেলেছ।

রফিক, শাকিল আর হাবিব নামতে নামতে এখন নীলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ওদেরকে দেখিয়ে নীলা বলে, চিন্তা করবেন না স্যার। এই যে ওরা, আমার বন্ধুরা, ওরা না খুব হেল্পফুল। ওদের কাছ থেকে জেনে নেব। রাহাত স্যার রাগী চোখে দেখেন নীরার বন্ধুদের। মনে মনে বলছেন, কেন নীরা, কেন? কী কথা উহাদের সাথে? হেরে যাওয়ার আগে সহজ-সরল ভোলাভালা মেয়েটাকে আরেকটু ডিটেইলে বুঝিয়ে বলেন, না না নীরা, সাবজেক্ট সম্বন্ধে কোর্স টিচারই সবচেয়ে ভাল বলতে পারেন, তাই না? বন্ধুরা পারলে তো আর টিচারকে প্রয়োজন হতো না। আমিই তোমাকে বুঝিয়ে দেব, কেমন? ক্লাসের পর রুমে এসো, ঠিক আছে নীরা?

হ্যাঁ বা না কিসিমের ভঙ্গিতে মাথাটা হেলিয়ে নীলা চেপে রাখা দম ছাড়ে। ঠিক সেই সময়েই ছটফট করতে করতে ছুটে আসে মৌরি। নীলার মতো ওরও আজকে লেট। মেয়েটা বিশাল এক সংসারের বড় মেয়ে। মায়ের সাথে সাথে সংসারের কাজ করতে হয়। সময় পেলে পড়া, ক্লাসে আসাটা হয়। নীলার ভারি মায়া লাগে খুব ভাল এই মেয়েটার জন্য।

মৌরি কথার ঘোড়া ছুটিয়ে দেরি কেন হ’ল, তার কি এক ব্যাখ্যান দিতে দিতে থেমে গেল। শাবাবের ভাব কায়দা এখন গব্বর সিং কিসিমের। আর তাই মৌরি কেন, ওরা সব ক’জন চুপ হয়ে দেখতে থাকে শাবাবের কান্ডখানা। শাবাব ভ্রু কাত করে চোখ-মুখে কি রকম এক ভাব করে নীলাকে বলে, রাহাত স্যার তোকে দেখলেই সুনীল হয়ে যায়। ব্যাপারটা আমার পছন্দ নয়।

মৌরি ওসব পাত্তা না দেওয়ার পক্ষে। বলে, নীলার স্টকে ওরকম বহুত আছে। তাই না রে নীলা?

হু, ফোর্থ ইয়ারের সুমন ভাই রোমান্টিক হিরো, মাস্টার্সের আশফাক ভাই রোমান্টিক-একশন…বলতে না বলতে উত্তম কুমার হাজির….ঐ যে দ্যাখ। ব্যাটা বাঁচবে অনেক দিন। রফিকের গলায় ঝরে পড়ে ক্ষেদ, ঈর্ষাসমেত।

পাঞ্জাবি পরা সুমন ভাইয়ের হাতের তালুতে আজকাল নীল একটা রুমাল জড়ানো থাকে। নীলাকে দেখলেই রুমালটা খুলে ঘেমে ওঠা মুখটা মুছতে থাকে জোরে জোরে। আজও তাই হ’ল। ঘাম মুছতে মুছতে এগুচ্ছে বেচারা। তাকে দেখে অতিরিক্ত বিনয়ে গলে পড়ে শাকিল। বলে, স্লামালাইকুম সুমন ভাই। আপনার কাজটা হয়ে যাবে এক্ষুণি।

বেচারা সুমন ভাইয়ের কোন্ কাজ হবে বা হতে যাচ্ছে, কে জানে! কিন্তু কাজটার ধরণ বোধহয় স্পর্শকাতর। যেভাবে লাল হয়ে গেল মুখটা ! তড়বড় করতে করতে বলে, না না, শাকিল। এখন দরকার নেই। পরে, হ্যাঁ, পরে।

শেষ বারের মতো নীলার দিকে দারুণ ঘন এক দৃষ্টি হেনে চলে যায় সুমন ভাই। মৌরি চেপে ধরে শাকিলকে। কি কাজ রে? ও ব্যাটার কোন্ কাজ করে দিচ্ছিস্? লিগ্যাল না ইললিগ্যাল?
রফিক রে, বল্ এখন। কাজটায় তোরও তো শেয়ার আছে।

এতক্ষণ চেপে রাখা হাসিটা বিস্ফোরণ ঘটাল রফিকের মুখে। অট্টহাসির চোটে কথা আর বোঝা যায় না। অগত্যা খোলাসা করতে হ’ল রফিককেই। বলল, নীলার ফোন নম্বর জোগাড় করে দেওয়ার কথা ছিল আমাদের। আমার আর রফিকের। স্রেফ একটা ফোন নম্বরের আশায় তিন দিন চটপটি-আইসক্রিম দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করেছেন মহামান্য সম্রাট সুমন শাহ্।

দিলেই পারতি।

নীলার কথায় অবাক হয় ওরা। শাকিল বলে, তুই বলছিস্?

হু।

তোমারও তাহলে আগ্রহ আছে ! শাবাব বলতে বলতে গব্বর সিং হয়ে যায়।

থাকতেই পারে। মৌরি মজা পায় শাবাবের কান্ড দেখে। বলে, দিয়ে দিস্ ফোন নম্বরটা। বোরিং লাগলে নীলা না হয় টুকটাক টকিং চালাল।

এই বার কেন যেন ক্ষেপে যায় রফিক। তেড়ে উঠে বলে, হবে না। নীলার ফোন নম্বর আমি ছাড়া আর কেউ জানবে না। কভি নেহি।

চট্ করে শাকিল কলার চেপে ধরে রফিকের। নীলা মুচকি হেসে হাঁটা শুরু করে। এসব পাগলামি কতক্ষণ সহ্য হয় !

পেছনে তিন যুবক দাঁড়িয়ে। শাবাবের চোখে-মুখে কষ্ট। রফিকের বুকে হতাশা। শাকিল দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। মৌরি ওদের তিনজনকে সমবেদনা জানিয়ে বলে, ছোড়্ দে ইয়ার। নীলা সবার সয় না। বিপদজনক রত্ন। পাথর। ওরা তিনজনই বলে ওঠে এক সাথে।

নীলার পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে মৌরি প্রশ্ন করে, তুই কি সত্যিই পাথর?

হু, ছুঁয়ে দ্যাখ্।

না বাবা। ওসব ছোঁয়াছুঁয়ির মধ্যে নেই। তুই বাপু ডেঞ্জারাস। ছেলেগুলে বলে আর আমি মুখ বুজে সই। কী করব? কী করে বলব সখি, আমিও যে তোমায় বড় পেয়ার করি।

দূর!

তুই কি আসলেই পাথর?

হ্যাঁ রে। আমি আসলেই পাথরের তৈরি। শুধু চোখ দু’টো পাথর না। তোর চোখে বৃষ্টির পানি জমে জমে সমুদ্র হয়ে গেছে।

আমি দেখেছি। আমি বুঝেছি। এই জন্যই তো তোকে এত ভালোবাসি।

আস্তে বল্, নইলে তোর প্রেমিকগণ আমাকে জ্যান্ত পুতে ফেলবে।

দুই নারী হাসে হা হা করে। হাসতেই থাকে। হাসতেই থাকে। আকাশের দূরাগত কোন প্রান্তে ঝোলানো ঘন্টাধ্বনির মতো বাজছে ওদের হাসি। তখন কেউ কেউ ভ্রমে পড়ে যায়, ভাবে তাদের নিজস্ব ঘন্টাগুলো বুঝি বেজে উঠল এই বার!

কেউ আছে কোথাও।

মৌরির সাথে খুব হাসাহাসি হয়েছে আজ। সেই রেশ রয়ে গেছে এখনও। ঠোঁটের কোণায় হাসির ভগ্নাংশ ঝুলতে দেখে নীলার মাত্তর দুই বছরের বড় বোন শীলা জড়িয়ে ধরে নীলাকে। বলে, ঘটনাটা কি? আজ কাকে আইজুদ্দি বানালি?
কাকে কাকে, তাই বল্।

বাদ্ দে তো এসব। পারমানেন্ট কিছু ভাব।

তুই ভাবছিস্, তাতেই আমার চলবে।

শিলার মুখটা গম্ভীর হয়। বলে, ঝামেলাটা পারমানেন্টলি চুকিয়ে দেব ভাবছি।

আবার ঝগড়া হয়েছে? তোরা পারিস্ ও বটে!

মানে?

কথায় কথায় এ্যাতো ঝগড়া হয় কেন তোদের? বিয়ের পরে দেখবি প্রতি মাসে বাড়ি পাল্টাতে হবে। এলাকাবাসী সম্বর্ধনা দিয়ে তাড়াবে।

ছোটলোকটা আমার কথা শুনলেই তো হয়। তাহলে কি আর আমার মেজাজ খারাপ হয়?

ছোটলোক! রাহাত ভাইকে তুই ছোটলোক বললি? এই তোর প্রেমেটিক ল্যাঙ্গুয়েজ?

আর কি বলব? বলতে বলতে তো স্টক ফুরিয়ে গেছে।

নীলা মনোযোগ দিয়ে দেখে শীলার চোখের গভীরে খেলতে থাকা ছায়ার রং। বলে, ভালোবাসাবাসির খেলায় তোর টায়ার্ড লাগছে?

শীলার মুখটা লাল হয়। যদিও মুখে বলে, তা তো লাগছেই। রিটায়ারমেন্টে যাব ভাবছি।

সত্যি করে বল্ না। আর ইউ টায়ার্ড?

খানিকক্ষণ সময় নেয় শীলা। তারপর লাজুক মুখটা নাড়তে নাড়তে বলে, না।

তোদের এ্যাতে ঝগড়া হয় কেন ? আন্ডারস্টান্ডিং-এর প্রব্লেম?

নাহ্।

তাহলে?

এমনি এমনি ঝগড়া হতে পারে না? ও তুই বুঝবি কেন? তুই কখনো তোর পছন্দের মানুষের সাথে উদ্দেশ্যমূলক ঝগড়া করেছিস্?

উদ্দেশ্যমূলক ঝগড়া?

থাম্। বড়দের সব কথা শুনতে নেই। শীলার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, রাহাতের সাথে ঝগড়াটা ও নিজে কেন বাঁধায়। এমনকি রাহাতকেও কখনো বলা যাবে না। রাহাতের কথা মন থেকে সরিয়ে শীলা বোনটার গলা জড়িয়ে ধরে নরম গলায় প্রশ্ন করে, সত্যি করে বল তো, কাউকে তোর ভাল লাগে না ?
নাহ্ ! প্রেমে পড়াটা বোকার মতো কাজ। শুধু কষ্ট। দেখিয়া জানিয়াছি। এরপর গুনগুন করে সুর তোলে গলায়-প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে। সুর থামিয়ে জামার কলার উঁচু করে ধরে গর্বের সাথে বলে, আমাকে এখনো কেউ ফাঁদে ফেলতে পারেনি। হাততালি। মারহাবা।

ফাঁদে পড়তে ইচ্ছে হয় না তোর? সত্যি করে বল্।
নীলা জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে স্বপ্নমদির কণ্ঠে বলতে থাকে, ঝমঝম বৃষ্টির দিনে দেখা হয় যেন তার সাথে। তার হাতে এক গোছা কদম ফুল। আমার মুখ ভিজছে, চোখ ভিজছে। আমার ভেজা খেঁাপায় ফুলগুলো গুঁজে দিয়ে সে মুগ্ধ হয়ে দেখবে আমাকে। তার মুখ ভিজছে, চোখ ভিজছে। আমি ভেজা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলব….

শিলা ওর পাশে এসে দাঁড়ায়। হাসছে।

নীলা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। হাসছে কেন শীলা? জবাবে শীলা বোনের মুখটা চোখের সামনে এনে বলে, পাথরের এমন রূপ….বাব্বাহ্!

নীলা কোমলতম কণ্ঠে বিড়বিড় করে, ঝমঝম বৃষ্টির সেই দিনের আশায় পথ চেয়ে আছি।

হবে। দেখা হবে।

হবে?

শীলা মাথা নাড়াতেই নীলা খুশিতে বোনকে জড়িয়ে ধরে গান করে। শিলাও গলা মেলায়। দুই বোনে বৃষ্টিহীন রাতে বৃষ্টির গান গায়– ঝরঝর মুখর বাদল দিনে……!

এই বৃষ্টি নীলাকে ছাড়ে না। পরদিন ক্যাম্পাসে আড্ডা দেওয়ার সময় মৌরির দিকে তাকিয়ে বলে, বর্ষাকে বরণ করা যায় কিভাবে বলতো।

মৌরি অবাক। এই সেদিন না গ্রীষ্মকে সেলিব্রেট করলাম? দিন যে কী দ্রুত যায় !

বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। এখনো হ’ল না। দূর! নীলার চোখের দিকে তাকিয়ে হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে শাবাব। সুমিও বলে, এখনো হ’ল না। নীলা শাবাবের দৃষ্টিকে না বোঝার ভান করে উড়িয়ে দিয়ে সুমিকে ফ্রি কনসালটেন্সি দিতে শুরু করে, রফিককে মনের কথাটা খুলে বল।

কী কথা, কী কথা… মৌরি আবৃত্তি করে, সে কথা শুনিবে না কেহ আর, নিভৃত নির্জন চারিধার, দু’জনে মুখোমুখি, গভীর দুখে দুখি….। এটুকু শুনেই নীলার দিকে ঈর্ষার দৃষ্টি শুধু নয় দীর্ঘশ্বাসও ছুঁড়ে দেয় সুমি। বলে, সে কথা শোনার আগ্রহ তার হবে না। কনসালটেন্ট নীলা সুমির পিঠে চাপড় মেরে প্রেসক্রিপশন দেয়, তাহলে ঐ গাধার চিন্তা তুই বাদ দে।

নীলার মাথার ভেতরে বর্ষা, আষাঢ়, শ্রাবণ। বলে, আচ্ছা, পয়লা আষাঢ় আমরা সবাই এক রকমের শাড়ি পরলে কেমন হয়, বল্ তো? কেমন হয়, সেটা শুধু বল্। শাড়ির ব্যাপার আমি দেখছি।

অন্যরা না করে না। নীলার এরকম ব্যাপার দেখাদেখির সময় ওরা না করতে পারে না। নীলার উৎসাহটা ওদের ভেতরও সংক্রমিত হয়। এরকম উৎসাহে ওরা ছেলেবন্ধুদের আড্ডায় ফেলে রেখে বেরিয়ে পড়ে। আজ সারা দিন ক্লাস-ফ্লাস বাদ। আজ হচ্ছে শাড়ি দিবস। ঢাকা শহরের সব শাড়ির দোকান ঘুরে দেখা হবে। সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা নীলা কিনবে। কিনবেই।

এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে ওরা যখন ঘুরছে তো ঘুরছে, তখন ফ্রেমে আমরা ঠিকই একটা শাড়ির দোকান খুঁজে পাই। দরজা ঠেলে হৈ চৈ করতে করতে বান্ধবীদের নিয়ে সেই দোকানটায় ঢুকল নীলা। ঘুরে ঘুরে শাড়ি দেখছে সবাই। হঠাৎ-ই নীলার চোখে বর্ষার মেঘ আটকে যায়। বৃষ্টি হওয়ার আগ মুহূর্তে মেঘটা যেমন অভিমান করে থাকে, তেমনি ছাইমাখা নীল। আঁচলে আবার কেঁদেকেটে মন হাল্কা করে ফেলা আকাশের সুখী তৃপ্ত নীল রং। কী চমৎকার ! নীলার মন ভরে যায়।

জামান পাশ থেকে কথা বলে ওঠে, শাড়িটা দেখবেন? একদম নতুন কালেকশন। আজই এসেছে।

জামান শাড়িটাকে খুলে খুলে দেখাচ্ছে। নীলা দিব্যি চোখে দেখতে পেল আকাশের শরীরটা খুলে গিয়ে নীল ছড়িয়ে দিল ওর চোখে মুখে। জামান বলে, আষাঢ় শ্রাবণ।

নীলার মনের ভেতর লতা মুঙ্গেশকর গেয়ে ওঠেন, মানে না মন। ঝরঝর ঝরঝর ঝরছে। তোমাকে আমার মনে পড়ছে।

শাড়ির নীল থেকে চোখ চলে গেল শাড়ি খুলে দেখাতে থাকা মানুষটার মুখে। জন্মাষ্টমী উৎসবে এরকম নীল মুখের কৃষ্ণকে দেখেছে নীলা। মানুষটার চোখের তারায়, মুখের ত্বকে নীল, আকাশের নীল। সেই নীল দেখতে গিয়ে নীলা হারিয়ে যায়। পাশ থেকে কথা বলে ওঠে মৌরি। আর কোনো রঙে আছে? সবাইকে মানাতে হবে তো।

মৌরি গাধিটা আর কোনো রং চায় কোন্ আক্কেলে? ওর চোখ নেই। ও বর্ষা দেখতে পায় না। আসলেই তাই। ফ্রেমটা ক্লোজ করে দেখা গেল, নীলাই একমাত্র নীল চিনেছে, জামানের মুখে-চোখের তারায় নীল পেয়েছে। অন্যদের চোখে যা পেল না, নীলার চোখ কেন পেল, কিভাবে পেল কে জানে। হাজারো ক্লোজ শটে এই প্রশ্নের জবাব এনে দিতে পারবে না, আমি নিশ্চিত।

জামান তরুণী ক্রেতাদের কাছে উৎসাহ নিয়ে জানতে চায়, একই রকম শাড়ি চাই আপনাদের?

হু। একদম এক রকম।

রূপা ব্যাখ্যা করে, পরলে যেন মনে হয় বর্ষাকালকে স্বাগত জানাচ্ছি। বর্ষা বর্ষা ভাব থাকবে শাড়িতে।

জামান ভেতরে ভেতরে খুশি হয়। এই আপারা দারুণ মুডে আছে, শাড়ি কেনার মুডে। একটু জমিয়ে ফেলতে পারলে অনেকগুলো শাড়ি বিক্রি করা যাবে আজ। ওদের মুড আরো ভাল করার জন্য, আরেকটু জমিয়ে তোলার জন্য ও কথা বাড়াতে থাকে। তরুণী মেয়েদের সাথে কথা বললে তারা খুশি হয়। তরুণী মেয়েরা নিজেদের মায়ায় বেঁধে নেয় বিক্রেতাকেও, তখন না কিনে পারে না। ও বলে, বর্ষা কালেকশনের কিছু শাড়ি আছে আমাদের।

জামান শাড়ি দেখাচ্ছে। ওরা খুশি হচ্ছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কোনটা নেবে। মৌরি নীলাকে কাঁধ দিয়ে ধাক্কা মেরে বলে, তুই বল্ নীলা, কোনটা নিবি?

নীলার কণ্ঠে বর্ষার মেঘ, জমাট বাঁধছে। বলে, তোরাই বল না।

রূপা ঝগড়াটে ভাব নিয়ে বলে, তোর উৎসাহে সব হচ্ছে, আর তুই কিনা এখন দমে যাচ্ছিস্?

নীলা কণ্ঠের মেঘ মৌসুমি বাতাসের সাথে উড়িয়ে দিতে চায়। শাড়িগুলো এলোমেলো করতে করতে বলে, মোটেও না। ও সিরিয়াসলি শাড়ি দেখতে থাকে। জামান প্রথম দেখা সেই শাড়িটা এগিয়ে দেয়। কিছু বলে না। নীলা নিজের অজান্তেই কেমন অঁাকড়ে ধরে শাড়িটা। নীলা বুঝি এই শাড়িটাই নেবে, অন্যরা বুঝেসুঝে খুশি হয় অথবা খুশি হওয়ার ভাব দেখায়। জামান বুঝতে পারে কোন্ শাড়িটা বিক্রি হচ্ছে। বুঝতে পেরে শাড়িগুলো প্যাক্ করতে ব্যস্ত হয়।

ওদিকে ওরা কথা বলছে নিজেদের ভেতর। মৌরি তৃপ্তির সাথে বলে, খুব সুন্দর শাড়িটা।

রূপা নীলার গালে টোকা মেরে বলে, পছন্দটা কার দেখতে হবে না?

সুমি নীলার কাঁধে হাত রেখে গলা নিচে নামিয়ে বলে, লাইফ পার্টনারের ব্যাপারে কারেক্ট ডিসিশান যেন নিতে পারিস্, এই দোয়া করলাম আকষর্ণীয় শাড়ি প্রাপ্তি উপলক্ষে।

নীলার মুখে রোদ নেই, কেবলি মেঘের ভার। বুকের ভেতর গুমোট গরম, বৃষ্টি হওয়ার আগে প্রকৃতির বুকখানায় যেমন হয়। ও ব্যাগ থেকে টাকা বের করে জামানের দিকে বাড়িয়ে দেয়। জামান টাকাটা নিতে গিয়ে ওর হাতের কোথাও কি ছুঁয়েছে ? তেমন কিছু দেখতে পাইনি, তবে কেন যে গরম হলকা নীলার হাত জড়িয়ে ধরে! বন্ধুদের ঠেলাঠেলির ফলে নীলা বেরিয়ে আসে দোকান থেকে। কিন্তু কেন যে বুকভরা তৃষ্ণাও সাথে নিয়ে আসে, ও বুঝতে পারে না। নীল নীল আকাশের নীল, মুখে কেন মাখামাখি ছিল, চোখের তারায় কেন জমে ছিল নীল, কেন কেন….বুকের মাঝখানে জমে থাকা নীল নিঃশ্বাসের সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়ছে ওর চারপাশের বাতাসে। হায় হায়, নীলার পৃথিবীটা এভাবে হঠাৎ নীলে নীল হয়ে গেল কেন!

নীল যে কষ্টের রং। এই কষ্ট জড়িয়ে ধরেছে নীলাকে। ওর প্রতিটা ক্ষণ এখন নীল। ওর মুখ নীল রঙের, ও দেখতে পায়নি, শিলা পেয়েছে। ইউনিভার্সিটিতে যায়নি, বিছানায় শুয়ে শুয়ে দিন কাটাচ্ছে। ব্যাপারটা কী? অহেতুক বইয়ের পাতায় চোখ বুলাতে থাকা নীল নীলাকে প্রশ্ন করে শিলা, তোদের শাড়ি কেনা কেমন হ’ল? দেখালি না তো?

সারাক্ষণ টগবগ করে ফুটতে থাকা নীলাকে একদম ফুটো বেলুনের মতো চিমসানো দেখে চিন্তায় পড়ে শিলা। বলে, কি রে? শরীর খারাপ?

নীলা নিজেকে সামলাতে চায়। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলতে চায়, না। বলা হয় না।

এমন দ্যাখাচ্ছে কেন?

নীলা বলতে চায়, ক্যামন? চোখে প্রশ্নটা ফুটে ওঠে, কেন যেন মুখে বলা হয় না।

তোকে তো ভুতের মতোন দেখাচ্ছে। বিশ্বাস না হয়, আয়নায় দ্যাখ্।

শিলা নীলার সামনে আয়না ধরলে নিজেকে দেখে হেসে ফেলে নীলা। ও তো প্রেমে পড়া বা ছ্যাকা খাওয়া এলোমেলো মুখের মানুষদের দেখে এভাবেই হাসিতে ভেঙ্গে পড়ত। ওর মনের ভেতরের নীলা আজ ওকে দেখে হাসছে! নীলার হাসি দেখে আশ্বস্ত হয় শিলা। শাড়ির প্রসঙ্গেই ফিরে আসে আবার। বলে, বন্ধুরা শাড়ি পেয়ে খুশি হয়েছে তো?

দারুণ।

তুই যখন তখন গিফট দিস্ ওদের। ওরা তোকে কখনো কিছু দিয়েছে?

না। অবশ্য আই ডোন্ট এক্সপেক্ট এনি থিং। ওদের সামর্থ্য নেই, তাই…

তোর গত জন্মদিনে আমি তোকে এক টাকার একটা কয়েন দিয়েছিলাম।

তুমি কী বলতে চাচ্ছ?

তোর কি মন খারাপ?

না। আমার মন মোটেও খারাপ না। আমি খুবই ভাল মনের মেয়ে। এটুকু বলেই নীলা ছটফট করে ওঠে। দু মিনিটের ভেতর চুলটুল ঠিক করে বলে, বেরুচ্ছি। মনটাকে আরও ভালো করে আসি।

কোথায় যাচ্ছে নীলা? ওকে ফলো করো তো।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে রিক্সায় ওঠে নীলা। আকাশটা যাচ্ছেতাই রকমের সোনালী হয়ে আছে। সোনালী আলোতে নীলার মুখটায় নীল কেটে সোনালী আভা জাগছে দেখতে পাচ্ছি। কী অপুর্ব !

রিক্সা থেমেছে। কোথায় থেমেছে? চেনা চেনা লাগছে জায়গাটা। শাড়ির দোকান….এ কী ! গতকাল এই শাড়ির দোকান থেকে একগাদা নীল মুখে নিয়েই না বাড়ি ফিরেছিল নীলা ! আজকেও কী সংকোচ মেয়েটার মুখে। দারুন সপ্রতিভ নীলার এই হাল দেখে চমকে যাবে ওকে যারা চেনে সবাই। দোকানের ভেতরে ঢুকে পরক্ষণেই আবার বেরিয়ে এল। এরপর ঢুকবে কি ঢুকবে না এরকম যা তা ভাবছে। কোন কাজ করার আগে এত ভাবাভাবি নীলার স্বভাবে তো ছিল না। নাহ্, নীলা ঢুকল না। হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসে রিক্সায় চেপে বসল। অস্ফুট কণ্ঠে বলল, ইউনিভার্সিটি। রিক্সাওয়ালা ওকে নিয়ে এল ইউনিভার্সিটিতে। পড়ন্ত বিকেলেও ওকে দেখার জন্য চোখগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নীলা ওসব দেখেনি, ও রিক্সা থেকে নামে না। রিক্সাওয়ালাকে বলে, যেখান থেকে উঠেছি, ওখানেই চলেন। ফিরে চলেন।

নীলা ফিরে চলল। শাড়ির দোকানটার সামনে এসে লাফিয়ে নামলো। ভাড়াটাড়া দেওয়ার কথা মনে নেই, বুড়ো রিক্সাওয়ালাকে অপেক্ষায় রেখে কিছু না বলেই হনহন করে ঢুকে যায় ভেতরে। মনে হয় নিজের ভেতরের দ্বিধাকে পাত্তা না দেওয়ার জন্যই এই তাড়াহুড়া। অথবা বুকের ভেতরে দারুন অস্থির হয়ে ওঠা হৃৎপিন্ডের লাফ থামানোর জন্য শরীরকে ব্যস্ত করে তুলছে। টলমল পায়ে দোকানে ঢোকে। জামান অন্য ক্রেতাদের নিয়ে ব্যস্ত। ও জামানকে লক্ষ্য করতে থাকে শাড়ি দেখার ভান করে। ওকে দেখে ওকে কেনাকাটায় সাহায্য করার জন্য অন্য এক সেলসম্যান এগিয়ে আসলে ও থতমত খেয়ে যায়। আবোল তাবোল কি বলছে ঠিক নেই, এটা নেব না ওটা নেব, উহু না, ইস্, উম্ম, থাক্ ইত্যাকার কথাবার্তা নিয়ে ও আসলে এগিয়ে যেতে থাকে জামানের দিকেই। জামান অন্য এক মহিলাকে একটি শাড়ি দেখাচ্ছে। শাড়িটাতে জামানের হাতের ছোঁয়া, জামানের হাত শাড়িটাকে ছুঁয়ে দেখছে। মহিলাও শাড়িটা নেবে, এমন ভাব। নীলা খসখসে গলায় বেশ জোরের সাথে জানতে চায়, কত দাম এটার?

জামান ওর দিকে তাকায় না। শাড়িটা ভাঁজ করতে করতে বলে, স্যরি, শাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে।

নীলা আর্তনাদ করে ওঠে, না না, প্লিজ, শাড়িটা আমি চাই।

মোটাসোটা বপুর মহিলা বাধা দিয়ে বলে, শাড়িটা….

নীলা হাহাকারের সাথে বলে, আপনাকে অনুরোধ করছি, অন্য শাড়ি দেখুন প্লিজ।

মহিলা ক্রেতা অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে দেখে তেড়ে ওঠে। শাড়িটায় একখান টান মেরে বলে, আপনিই অন্য শাড়ি দেখুন।

নীলা টানমারা মহিলার হাত চেপে ধরে বলে, শাড়িটা আমাকে দিতেই হবে। বিস্মিত মহিলা ওকে দেখছে। আর জামানও দেখছে…জামান ওকে দেখছে !

নীলা মহিলাকে বলে, আসলে হয়েছে কি, আমার একটা মাত্র বোন…ও কাল এটা পছন্দ করে গেছে। দু’ দিন পর ওর বিয়ে, আমেরিকা চলে যাবে…খুব আদরের বোন, ওর একটা শখ আমি পূরণ করতে পারব না?

মহিলার মন নরম হয়ে যায়। অন্য শাড়ি দেখতে থাকে। জামান শাড়িটাকে প্যাকেট করতে করতে নীচু গলায় ওকে বলে, কাল আপনারা এই শাড়ি দেখেননি। এটা আজ এসেছে।

নীলা খুব খুশিতে ছটফট করে জামানের মুখোমুখি হয়। বলে, আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?

জামান মৃদু হেসে বলে, অনেকগুলো শাড়ি কিনেছিলেন। দামি কাস্টোমারকে না চিনলে হয়?

সেজন্য মনে রেখেছেন?

জামান ওর প্রশ্নটা বুঝতে পারে না। পাল্টা প্রশ্ন করে বোকা বোকা কণ্ঠে, জ্বী!

না…কিছু না। নীলা মন খারাপ করে প্যাকেটটা নেয়। ফিরে আসে বাড়িতে। শাড়িটা পরে। শিলা খুউব খুউব অবাক হয়। বলে, ম্যানি ম্যানি চেঞ্জেস। বাড়িতে কখনো শাড়ি পরেছিস্?

আজ পরলাম। জানিস্, শাড়িটা খুলব না। রাতে এই শাড়ি পরেই ঘুমোবো। খুব সুন্দর শাড়ি, নীলার খুব পছন্দ হয়েছে বলেই বুঝি শাড়ি পরেই ঘুমাবে। হবে হয়তো।

ঘুমের ভেতরেই জেগে ওঠে নীলা। দিব্যি বুঝতে পারে, ও জেগে গেছে। আর যেখানে জেগেছে, তা মোটেও ওর ঘর নয়। খোলা একটা সিঁড়ির ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে ও।

ঘুমন্ত নীলা সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। তাকাচ্ছে উপরের দিকে। খোলা ছাদ দিয়ে আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে পড়ছিল। নীলা ভিজে যাচ্ছে। সিঁড়ির ওপাশ থেকে কদম ফুলসহ হাত দেখা গেল বুঝি। নীলা টার্ন নিতেই খুশি হয়ে ওঠে। আনন্দ উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে বলে, তুমি ! জান, কত কথা বলার আছে তোমাকে।

কাকে কী বলল নীলা? ও চমকে ওঠে। ভয় পায়। কেউ তো কোথাও নেই। অথচ কেউ ছিল। হারিয়ে গেছে। ও খুঁজতে থাকে তাকে। জান-পরান দিয়ে খুঁজতে থাকে। খুঁজতে খুঁজতে না পেয়ে জেগে ওঠে, যেন জেগে উঠলেই পেয়ে যাবে। নিঃসীম অন্ধকার রাত তখন মাত্র আদ্ধেকটা খরচ হয়েছে। এই সময়ে ও কেউ একজনকে খুঁজতে চেয়েছিল, না পেয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। ঘুম ভেঙ্গে ওঠা শিলা ওকে জড়িয়ে ধরলে ও কেবল বলতে থাকে, সে আছে, সে আছে।

শিলা ভাবে, ঘুমের ভেতরে কি দেখতে কি দেখেছে। নীলাটা আর বড় হলো না !

সিঁড়ি।

গাড়ির ভেতর নীলা, ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। ধরতেই বেজে ওঠে শাবাবের গলা, আজ ক্লাসটেস্ট আছে, ওকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। ইদানিং ফাঁকিবাজ হয়ে ওঠা নীলাকে নিয়ে ওর বন্ধুদের চিন্তার শেষ নেই। এইটুকু পথ আসতে আসতে মৌরি, রফিক, সুমি, শাকিল এই বার শাবাব, সবাই ওকে ক্লাসটেস্টের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

ড্রাইভার মোড় ঘুরতেই চমকে ওঠে নীলা। উত্তেজিত হয়ে ওঠে। শাহাবুদ্দিন, ডান দিকের রাস্তায় যাও তো…
কিন্তু আপা, ভার্সিটিতে…

যা বলছি তা-ই কর।

নীলা জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে। স্বপ্নে দেখা সিঁড়িটা চোখে ভাসছে। ড্রাইভারকে আবার তাড়া দেয়। থামাও। আমি বলছি, গাড়ি থামাও।

নীলাকে ফলো করো। গাড়ি থেকে নেমে ও যাবেটা কোথায়?

নীলা স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো গাড়ি থেকে নেমে যায়। রাস্তার বাড়িগুলো দৌড়ে দৌড়ে দেখছে। হঠাৎ একটা পুরনো বাড়ি দেখে থমকে যায় ও। গাছপালায় ঘিরে রেখেছে নির্জন বাড়িটাকে। নীলা লম্বা একটা দম নেয়। পুরনো ভাঙ্গা-চোরা পায়ে চলা ইটের রাস্তা বাড়ির ভেতর চলে গেছে। নীলা সেদিকে পা বাড়ায়। ওর শরীর কাঁপছে। ঐ তো ওপাশে বোধহয় একটা সিঁড়ি আছে, সিঁড়িটার অল্প অংশ দেখা যাচ্ছে। নীলা দম বন্ধ করে এগুচ্ছে।

নীলা অবাক হয়ে দেখে সিঁড়ির উপরে ছাদ নেই। আকাশ দেখা যাচ্ছে। সিঁড়িতে পা দিতেই ও কেঁপে ওঠে। সিঁড়ির ওপাশে তাকাতে ভয় পায়। আরেক ধাপ উপরে উঠতে গিয়ে থেমে যায়। নিজের চুলে হাত দেয়, খোঁপা নেই, খোঁপায় ফুল নেই। পোশাক দেখে নাক কুঁচকায়। অগত্যা ফিরে যায় মেয়েটা। ফিরে তো যেতেই হবে। এই চেহারায় ও তার মুখোমুখি হবে না। কার?

তার। জামানের।

জামান! জামান এখানে?

ওর মন বলছে, এখানেই দেখা হবে ওর আর জামানের। কেন যে ওর মন এরকম বলছে, কিন্তু বলছে। গত রাতের স্বপ্ন থেকে জামান যেন ওকে অন্য এক পৃথিবীর খোঁজে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ওর মনকে নিয়ন্ত্রণ করছে জামানের মন, এরকমই তো মনে হচ্ছে। জামানের সামনে গিয়ে জানতে চাওয়া যায়, ও জামান! তুমি কেন এমন করছ? কিন্তু নীলার মনে হচ্ছে, কাপড়ের দোকান বা আর কোথাও নয়, কেবল মাত্র খোলা ছাদের ঐ সিঁড়িটাতেই জামানের মুখোমুখি হওয়া মানাবে। ওখানেই নীলা জামানের কাছে জানতে চাইবে, ও জামান! তুমি কি সত্যিই আমার? আর সিঁড়িটার খোঁজ যেহেতু পাওয়া গেছে, সত্যি বলতে কি সিঁড়িটাকে ওকে যখন ঠিকই নিজের কাছে টেনে এনেছে, তখন জামানকে পেয়ে যাওয়াটা অসম্ভব কোন ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে না।

নীলার ভেতরে খুশি জমা হয়েছিল। ইউনিভার্সিটিতে ফিরে গিয়ে সেই খুশির জোরেই ঝাড়া বিশ মিনিট পর ক্লাসে ঢুকে টেস্ট খুব ভাল দিল। বন্ধুরা এসব নিয়ে কথা বলতেই ও হাসি মুখে রসিকতা করে, আমি কি জানি না কি তোরা প্রশ্ন ছাড়ছিস্ ? তাহলে আর এই অন্যায় করতাম না।
রফিক ওর হাসিটুকু নিজের ভেতরে পুরোপুরি গ্রহণ করে তৃপ্ত কণ্ঠে বলে, কত দিন পর তোর হাসি দেখলাম।

শাকিল জানতে চায়, সত্যি করে বল তো, কি হয়েছিল তোর?

অসুখ হয়েছিল। কঠিন অসুখ। এখন সেরে গেছে। হা হা হাসিতে সবাইকে আশ্বস্ত করে প্রায় নাচতে নাচতে বাড়ি ফেরে নীলা। আজকে আড্ডা দেবে না, কারণ ওর তাড়া আছে। ওর মনটা কেন যে ওকে এভাবে তাড়াচ্ছে। এই তাড়া খেয়ে ও যাবে কোথায়?

ফলো হার। ঐ যে বাড়ি ফিরে নীলা জামানের ছুঁয়ে দেওয়া শাড়িটা পরছে, খোঁপায় ফুল গুজছে। বিস্মিত শিলাকে তাড়া দিচ্ছে কুচি ঠিক করে দেওয়ার জন্য, খোঁপার ফুল ঠিক মতো সাজিয়ে দেওয়ার জন্য। শিলা গন্তব্য জানতে চাইলে থতমত খেয়ে বলছে, কিছু জিজ্ঞেস করো না প্লিজ। বলতে পারব না।

এতকাল সব কথা বলতে পারলি, আজ কেন পারছিস্ না ?

কী বলব, বুঝতে পারছি না। তুমি নিজেও পারবে না। কিচ্ছু জানি না আমি। শুধু জানি, জানি…আমার মন বলছে, সে আছে ওখানে। কাল তার সাথে আমার দেখা হবে। তার সাথে।
শিলা সোজা দাঁড়িয়ে পড়ে। নীলাটা অবশেষে প্রেমে পড়েছে ! ভেরি ভেরি গুড নিউজ। শিলা বোনকে জড়িয়ে ধরে জানতে চায়, কে সে? কী করে রে? শিলার প্রশ্নগুলো নাড়িয়ে দেয় নীলাকে। কে সে? কী করে? কী বলবে নীলা? নীলা বলে না কিছুই, আসলে বলতে পারে না। কোনোমতে ঠেকায় শিলাকে, এত তাড়া কেন?

ওকে, আই এম ওয়েটিং। বাট, মাই ডিয়ার লিটল সিস্টার, বেশিক্ষণ ওয়েট করা সম্ভব হবে না। ডেটিং থেকে ফিরেই কিন্তু সব বলবি।

কী অদ্ভুত কান্ড ! নীলা এবং ডেটিং।

অদ্ভুত ঘটনাটা কিন্তু সত্যিই ঘটল।

নীলা সিঁড়িতে পা দেওয়া মাত্র বৃষ্টি শুরু হ’ল টিপটিপ করে। ও যেন ঘোরের ভেতর পড়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে উঠছে, কি যেন বিড়বিড় করছে। চারিদিক থেকে ভেসে আসছে অচেনা সঙ্গীত। ল্যান্ডিং-এ এসে চোখ খোলে। সিঁড়ির আরো কয়েক ধাপ উপরে হাসি মুখে দঁাড়িয়ে আছে জামান। একহাতে কদম ফুল। আরেক হাত নীলার দিকে বাড়িয়ে দেয়। নীলা সে হাত ধরে উঠে আসে উপরে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে থাকে আগ্রহ নিয়ে। কথা বলে। জামান ওর খোঁপায় ফুল গুঁজে দেয়। নীলা কাঁদতে কাঁদতে ছোট বাচ্চাদের মতো হাপুস হুপুস করে বলছে, এমনো হয় কখনো? এই সিঁড়িটাকে স্বপ্নে দেখেছিলাম। খুব কেঁদেছিলাম। যে সিঁড়িতে তোমার সাথে দেখা হ’ল, সে সিঁড়ি কেন স্বপ্নেই পেলাম, সেই কষ্টে, সেই কষ্টে কেঁদেছিলাম।

জামান ওর কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে কথাগুলো ভাসিয়ে দিচ্ছে। এখন কোনো কষ্ট আছে?

একদম না। আমি তো এখন ভাসছি। সুখের সাগরে ভাসছি। জান, আমার জীবনে এমনটা ঘটবে, তা আমি কখনো ভাবিনি।

জীবনটা এরকমই। যা ভাবি না, তাই হয় সব সময়।

উহু…ভারি কথা একদম না। আচ্ছা, তোমার নাম কী? আমি নীলা। জান তো, নীলা সবার সয় না।

কথাটা হবে, নীলা সবার হয় না।

আমি তোমার হব। কথা দাও।

বেশ তো।

না তুমি কথা দাও।

কি কথা দেব?

এই হাত সরিয়ে নেবে না। আমাকে একা করে দেবে না। জান, আমি খুব একা। বন্ধুরা হট্টগোল করে, আমি হাসি, কথা বলি। কিন্তু মনের ভেতরটা একাকীত্বের যন্ত্রণায় ছটফট করে। কথা দাও, যেখানেই থাক, যেভাবে থাক, আমাকে রাখবে সঙ্গে।

তুমি থাকতে পারবে?

পারব।

বেশ। তবে তাই হোক। বৃষ্টির কসম, এই কদমের কসম, তবে তাই হোক।

দু’দিন পর আমার জন্মদিন। সাতই আষাঢ়। কি দেবে আমাকে?

ভালোবাসা।

সেদিনও যদি বৃষ্টি হয় তো দারুণ হবে। জান, আমি সারা জীবন ভেবেছি ঝমঝম বৃষ্টির এক সন্ধ্যায়…….

নীলা নামের অসাধারণ মেয়েটির জীবনের গল্প ঝমঝম বৃষ্টির ছটায় এলো মেলো হয়ে যায় সত্যিই। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে নিজের ঘরজা লাগিয়ে দেয় নীলা। এই রকম দরজা বন্ধ করা ওর গোটা জীবনে এই প্রথমই ঘটে। বন্ধ ঘরে একদম একা হয়ে নীলা ডায়েরি লিখতে বসে। ডায়েরি লেখাটাও ওর জীবনে এই প্রথমই ঘটে।

নীলা ডায়েরির পাতায় লিখছে, ‘আজ তার সাথে দেখা হ’ল। ৫ই আষাঢ়। আর দু’দিন পর আবার দেখা হবে।’ আবার দেখা হবে। আনন্দ আনন্দ আনন্দ। নীলার ইচ্ছে করে পাখির মতো ভেসে বেড়াতে, প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াতে। সমাজ-সংসার মিছে সব, মিছে এ জীবনের কলরব..হাহ্ !

৬ই আষাঢ় ভোর বেলায় ও আবার ডায়েরি লিখতে বসে। কী লেখে? ‘কাল দেখা হবে’। এরপর ? ‘কোন্ শাড়িটা পরব? নতুন শাড়ি, তুমি পছন্দ করবে, আমি কিনব।’

ওর আর ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া হয় না। জামানের পছন্দের শাড়ি কেনার জন্য ও প্রায় ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে যায়। লাজুক লাজুক মুখে ঢোকে দোকানে। কিন্তু একটু পর জামানকে না দেখে চিন্তিত হয়। এক সেলসম্যান এগিয়ে আসে ওর দিকে। তাকে দেখে নীলা প্রশ্ন করে, উনি কোথায়? ঐ যে, আপনাদের সাথে থাকতেন…নামটা….আস্তে আস্তে কথা বলেন, নামটা যেন কি….

জামান ভাই।

জামান। জামান। নীলার ভাল্লাগছে অতি সাধারণ নামটা উচ্চারণ করতে। আহ্, কী সুন্দর নাম, জামান।

জামান। জামানের সাথে একটু দরকার ছিল।

আমাকে বলেন আপা।

নীলা রেগে যায়। খুব রেগে যায়। তেড়ে উঠে বলে, কেন আপনাকে বলব? কী বলছেন আপনি? নীলা জোরে কথা বললে অন্যরা সচকিত হয়ে যায়। দোকানের অন্য আরেকজন বয়স্ক লোক এগিয়ে আসে। কী ব্যাপার?

আমার দরকার একজনকে, আর উনি বলছেন তাকে বলতে কী দরকার। কেন?

সেলসম্যান বিড়বিড় করে বলে, উনি জামান ভাইকে খুঁজছেন।

বয়স্ক লোকটা একই রকম ভাবে খুব যেন স্বাভাবিক ব্যাপার, এমন ভাবে খবরটা দেয় নীলাকে। পরশু সকালের ঘটনা। দোকানে আসার পথে রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে জামান।
পরশু ওর সাথে দেখা হয়েছে আমার। নীলা জোর গলায় বলে।

পরশু সকাল আটটা পনেরোতে মারা গেছে ও। দুপুরে ওর সাথে আমার দেখা হয়েছে। আপনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? কী ভেবেছেন, আমি মিথ্যে বলছি?

স্যরি ম্যাডাম, আপনি মিছেই….

কিসের স্যরি? মিথ্যে বলছে কে? আমি না আপনি? আপনার দোকানে এতদিন কাজ করছে, তার সম্পর্কে ইনফরমেশন দিতে পারেন না, আপনি একটা জঘন্য লোক। আপনারা সবাই। আসল কথা বের করতে পুলিশের সাহায্য লাগবে, বুঝতে পারছি। ওকে, আই ওয়ান্ট টু ফেস ইউ। অল অব ইউ।

নীলা রেগে বেরিয়ে যায়। লোকটা এবং দোকানের অন্য সবাই অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওকে দেখছে। মিনিট পাঁচেক ওকে নিয়ে একটু ফিসফাসও করল। তারপর মুছে গেল ও। যেমন মুছে গেছে জামান। কিন্তু নীলার মন থেকে কিছুই তো মুছছে না। শিলা সব শুনে যতই ব্যাপারটাকে স্রেফ হেলুসিনেশন বলে উড়িয়ে দিতে চাইছে, ততই বাড়ছে ওর কান্না। জামানকে কি ও হারিয়ে ফেলল, এই আক্ষেপে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে পাগলি মেয়েটা। বারবার বলছে, সত্যিই দেখা হয়েছে তার সাথে। তুমি বিশ্বাস কর।

শিলা ওকে বারবার বোঝাতে চাইছে, সত্যিই তার সাথে তোর দেখা হয়েছে। তবে সেটা বাস্তবে নয়, তোর কল্পনায়। তোর খুব ইচ্ছে হয়েছিল ছেলেটার সাথে দেখা করার। তোর মন ইচ্ছেটাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে দিয়েছে। তুই ভাবছিস্….

তোমার লজিক শুনে গা জ্বলছে আমার। সে আমাকে কদম ফুল দিয়েছিল, সেটাও কি কল্পনায়? এই যে ফুল, দ্যাখ, দ্যাখ।
শিলা উত্তাপহীন কণ্ঠে বলে, বর্ষাকালে কদম ফোটে। কিনতেও পাওয়া যায়।

তার মানে? আমি নিজে কিনে খোঁপায় পরে তোমার কাছে গুল ঝাড়ছি?

তা বলছি না।

বলছ না? তবে কী বলছ?

ছেলেটা নেই, এটাই সত্য। কষ্ট হলেও সেটাই তোকে মেনে নিতে হবে।

আছে, সে আছে। সে আমাকে কথা দিয়েছে, কাল তার সাথে দেখা হবে।

কোথায়, সেটা অন্তত বল্।

হু! বললে তুমি বাবাকে বলে গুন্ডা পাঠিয়ে ওকে মেরে ফেলবে।

শিলা অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারে না। দুই বোনের সম্পর্কের মাঝে এরকম কালো ছায়া ও আগে কখনো অনুভব করেনি। অনেকক্ষণ পরে এটুকু শুধু বলতে পারে, এসব কী বলছিস্?

নীলা গোঁয়ারের মতো ঘাড় শক্ত করে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলে, বাবা তার মেয়ের সাথে সামান্য একজন সেলসম্যানের ভালোবাসাবাসিকে খুশি মনে মেনে নেবে, এমনটা ভাবার মতো বোকা নই আমি।

শিলা হাল ছেড়ে দেয়। বলে, বেশ, কিছুই বলতে হবে না আমাকে। তুই যা। গিয়ে যখন দেখবি, কেউ নেই। ওটা সাধারণ একটা সিঁড়ি। তখন তোর ভুল ভাঙ্গবে।

নীলা চোখ মোছে। খুশি খুশি হয়ে ওঠে। শিলা ওর ভাব দেখে রেগে বলে, দয়া করে এই মাঝ রাত্তিরে ভুল ভাঙ্গাতে যেও না। অন্তত কালকে পর্যন্ত অপেক্ষা করো।

সেটুকু ও পারবে। কারণ, প্রস্তুতির জন্যও তো সময় লাগবে ওর। শাড়ি পরবে, সাজবে। ওদিকে মেঘেরাও প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে তার অপেক্ষায় আছে। আকাশ বৃষ্টির মালা দিয়ে বরণ করে নেবে ওদের। চারিদিকের সব আয়োজন বুঝি ওদের দুজনেরই জন্য। আর সেজন্যই বুঝি নীলা যখন ঝমঝম বৃষ্টি মাথায় করে ভোর বেলায় সেই পুরনো বাড়িটার ভেতরে ঢোকে, ইটের পুরনো পথটাতে পা দিতেই চারিদিক থেকে যেন নানান অস্পষ্ট কথাবার্তা ঘিরে ধরে ওকে। কে ও? ও কে ও? কে ও? ও কে ও?…………..

আজ নীলাকে কেমন অন্য রকম লাগছে দ্যাখ। ওর মুখটা ক্লোজ কর, কেমন সুখী সুখী ভাব। যেন ওর চেয়ে সুখী মেয়ে এই পৃথিবীতে আর একটিও নেই। ওর পায়ের ছন্দে মাটি দুলছে, মাটিকে জড়িয়ে ধরা ঘাস-লতা-বুনো ফুলেরা আল্লাদে গড়িয়ে পড়ছে।

ফলো হার। কুইক।

পথটা পার হয়ে ভেতরে পা দেয় নীলা।

কে ও? ও কে ও? কে ও? ও কে ও?…………..

কথাবার্তা আরো অস্পষ্ট হয়ে গুমগুম জাতীয় শব্দে পরিণত হতে থাকে। দূর থেকে যেন ঢাকের আওয়াজ আসছে। নীলা সিঁড়িতে পা দেওয়ার আগে ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় আকাশে। মেঘ ডাকে, বৃষ্টি হচ্ছে। সিঁড়িতে পা দেওয়া মাত্র ঢাকের আওয়াজ স্পষ্টতর হয়। ওম্মা, ঢাকের সাথে দেখি সানাই মিলে গেল ! বিয়ের সানাই। এতসব শুনে নীলা লাজুক লাজুক মুখে চোখ বন্ধ করে উঠতে থাকে সিঁড়ি বেয়ে। ল্যান্ডিং-এ এসে থামে, চোখ বন্ধ করে হাত বাড়িয়ে দেয় সামনে। ও নিশ্চিত, জামান ওর বাড়ানো হাত ধরে কাছে টেনে নেবে ওকে। ফিসফিস করে, তুমি ছুঁয়ে দিলে আমি পবিত্র হয়ে যাব। বৃষ্টির কসম, তোমার কসম, আমি পবিত্র হয়ে যাব।

ওর হাতে জামানের ছোঁয়া নেই এখনো। অস্থির নীলা ছটফট করে ওঠে। বলে, কেন দেরি করছ?
কেন দেরি করছে জামান ? আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না। জামান, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ না? জামান, কোথায় তুমি ?

নীলা চোখ খুলে দেখে কেউ নেই। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ও। সব শব্দ থেমে যায়। নীলার বুকের ভেতর থেকে ভেসে আসা হৃৎপিন্ডের ধুকপুক শব্দও থেমে যায়। আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টি আর ও কান্না একদম ঝাপসা করে দেয় চারিদিক। কোথাও কি কেউ নেই ?

হঠাৎ চোখ পড়ে সেদিন দু’জনে সিঁড়ির যে ধাপে বসেছিল, সেখানে এক তোড়া কদম ফুল রাখা।

ক্লোজ টু কদম। সিঁড়ির ধাপটাতে কদম ফুলই তো, না কি?

নীলা ছুটে যায়। ফুলগুলো ছুঁয়ে খুশি হয়ে ওঠে। ওর মুখে আবার সেই লাজুক হাসি ফিরে আসে। উঠে দাঁড়িয়ে ফুলগুলো খোঁপায় পরে। তারপর দু’হাত তুলে কথা বলে নিচু স্বরে। হাতের ভেতর বৃষ্টির পানি জমতে থাকে। নীলা বলে, আমি তোমার কাছে যাব। এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া। তোমার কাছে যাব।
নীলা যাবে, কোথায় যাবে?

জামান, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

কোথায় জামান? জামান কি নীলার কথা শুনতে পাচ্ছে?

নীলা নিজের বুকে বৃষ্টিজমানো মুঠো ধরে কাতর কণ্ঠে বিড়বিড় করে, মনে মনে তোমাকে কেমন ব্যাকুল হয়ে চাইছি, তা টের পাচ্ছ?

জামান কি টের পাচ্ছে?

সেদিন তুমি কথা দিয়েছিলে, আজ দেখা হবেই। আমার কসম, বৃষ্টির কসম, কদমের কসম। তোমার সাথে আমার দেখা হতে হবেই। না হলে বাড়ি ফিরব কীভাবে?

অস্পষ্ট শব্দ, ঢাকের আওয়াজ, বিয়ের সানাই। শুনতে পাচ্ছ?

নীলা শুনতে পাচ্ছে। ওর হাতের পানি গড়িয়ে পড়ে।

অস্পষ্ট শব্দ, ঢাকের আওয়াজ, বিয়ের সানাই। সিঁড়ির উপর থেকে ভেসে আসছে।

নীলা উপরে উঠতে থাকে।

খোঁপা থেকে কদম ফুল কেন যে খুলে পড়ল। খুলে পড়েছে সিঁড়ির ধাপে। নীলা খেয়াল করেনি। ও শুধু উঠছে। আহা, ফুলহীন খোঁপা নিয়ে ও যাচ্ছে, খেয়াল করছে না…কেন যে করছে না ! ফুলহীন খোঁপা নীলাকে কেমন বিষণ্ন করে তুলেছে দ্যাখ।

ঐ তো উপরে বন্ধ দরজা। অস্পষ্ট শব্দ, ঢাকের আওয়াজ, বিয়ের সানাই। নীলা খুশি হয়ে ওঠে। আগের চেয়ে দ্রুত পায়ে উঠতে থাকে। দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। উত্তেজনায় কাঁপছে ও। দরজায় নক্ করে নিজেকে একটু সামলে। একটু পর আবার করে। কোন সাড়া শব্দ পায় না দেখে এবার একটু জোরে করে। তারপর আরো জোরে। নীলা কাতর কণ্ঠে ফিসফিস করে কথা বলে। আমি এসেছি। আমি এসেছি।

নাহ্, কোনো জবাব নেই। নীলা দরজায় মাথা ঠেকিয়ে কাঁদছে আর নক্ করছে।

অস্পষ্ট শব্দ, ঢাকের আওয়াজ, বিয়ের সানাই থেমে যায়। হঠাৎ। সব শব্দ থেমে যায়। যেন কেউ একজন থামিয়ে দিয়েছে সবকিছু। যেন কেউ একজন কথা বলে উঠবে। নীলা নিজের অজান্তেই কান খাড়া করে ওঠে, আর শোনে বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসছে জামানের কণ্ঠ। জামান জানতে চাইছে, কে?

নীলা ব্যাকুল হয়ে বলে, আমি। আমি। আমি এসেছি। আমি তোমাকে দেখতে চাই। তুমি দেখা দাও।

আবার নীরবতা।

আবার কথা বলে ওঠে নীলা। বলে, আজ আমাদের দেখা হবে। মনে নেই, তুমি কথা দিয়েছিলে? আমি এসেছি। তুমি কেন আড়ালে আছ? দরজা খোল। আমি তোমাকে দেখব।

দেখবে?

দেখব। দেখব।

জুম ইন করো তো বাপু। নীলার সাথে জামানের দেখা হবে। ওদেরকে আমি ক্লোজে পেতে চাই। ডিটেইলস লাগবে আমার, বুঝেছ?

আবার শুরু হয়েছে অস্পষ্ট শব্দ, ঢাকের আওয়াজ, বিয়ের সানাই।

দরজা খুলে যাচ্ছে ক্রমশঃ। নীলা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে-মুখে খুশি, দারুণ খুশির ছটা। ভেতর থেকে তীব্র আলো এসে পড়ছে ওর শরীরের উপর। আলোয় আলোকময় হয়ে গেল নীলা, যেন আলোর পাখি হয়ে উড়ে গেল নিঃসীম মহাকাশে।

জুম ইন।

আলো। শুধু আলো।

কদম। বৃষ্টি।

বৃষ্টি পড়ছে।

সিঁড়ির ধাপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা কদম ফুলগুলো বৃষ্টিতে ভিজছে। এভাবেই ভিজবে। ভিজবে।

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]