বিকেল সাড়ে পাঁচটা। পশ্চিমাকাশে সূর্য ঢলে পড়ার এ সময়টা বেশ ঘোর লাগানো। আলো-ছায়ার মিশ্রণের এ সময়টাতে দোকান থেকে এক ঘন্টার ছুটি নেয় মিথুন। দোকান বলতে বিভিন্ন ধরনের মোবাইল আর লোডের দোকান। বিকাশ, এমক্যাশ সবই আছে এখানে। একটা বড় রকমের শো-কেসে সারি সারি মোবাইল সাজানো থাকে। অবশ্য এটা সবসময় তালা লাগানো থাকে। সেখানে হাত দেওয়ার অধিকার নেই মিথুনের। দোকানের নাম সাজিদ টেলিকম। উপরে বড় করে একটা মোবাইল কোম্পানির সাইনবোর্ড দেওয়া। আর মাঝে ছোট করে লিখা সাজিদ টেলিকম। দোকানের একটু ভিতরে ক্যাশ বাক্সে বসে দোকানের মালিক। আর সামনের দিকে বসে মিথুন। চিকন ধরনের কয়েকটি ছোট্ট খাতায় মানুষের রঙ-বেরঙের মোবাইল নম্বর লিখে সে। এই ক’দিনে মিথুন খেয়াল করেছে নাম্বারেরও সৌন্দর্য্য আছে। কয়েকটা সহজ। মিলে যায় কেমন জানি, আবার কয়েকটা কঠিন। এগুলোকে কম সুন্দরের কাতারে ফেলে মিথুন। এভাবে দিন চলে যায় মিথুনের। সারাদিনে মাত্র একবার ছুটি নেয় সে। শুধু ঐ এক ঘন্টাই। তাই দোকান মালিকেরও কোন অভিযোগ নেই মিথুনকে নিয়ে।


২.

ম্যানেজার আসগর আলী সাহেব আগেই বলে দিয়েছে বিপাশাকে, আজ বিশেষ কাস্টমার আছে। আসগর আলীর ছোট বেলার বন্ধু। চট্টগ্রাম থেকে আসছে। একটু আলাদা খাতির করতে হবে। বিপাশা যা বুঝার বুঝে নেয়। সে ম্যানেজারের চরিত্র মনে করার চেষ্টা করে। তারপর নিজের কল্পনা মিশিয়ে ম্যানেজারের বন্ধুর মুখটা ভেবে নেয়। মাসে এরকম তিন-চারজন বন্ধু আসে। বিপাশা জানে এগুলো কেউ আসগর আলীর বন্ধু না। দামী কাস্টমার। টাকা একটু বেশি দেয়। তাই আলাদা খাতির যত্ন। বিপাশার সাথে আসগর আলীর চুক্তি মাসিক হিসাবে। পনের হাজার টাকা বেতন। এর উপর উপরি পাওনা হিসেবে বকশিস তার নিজের। বিপাশার প্রথম দিনটার কথা মনে পড়ে। একটা টিয়ে রঙের সালোয়ার কামিজ পড়ে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছিল। অজানার উদ্দেশ্যে গ্রাম ছেড়ে আসা মেয়েটি ঢাকা শহরের চাকচিক্য দেখে বোকা বনে যায়। গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম দিকটার যাত্রী ছাউনিতে পেছন দিক থেকে এসে একটা লোক তাকে বলেছিল, আমি আপনাকে চিনি। হোটেল খুঁজছেন? আসুন আমার সাথে। আমার জানাশুনা ভালো হোটেল আছে। শুভা লোকটার পিছু যেতে থাকে। তার একটুও ভয় করে না। তারপর একটা সিএনজি’তে উঠে মুহূর্তেই হারিয়ে যায় বড় বড় বাসগুলার সামনে থেকে। একটা মাঝারি ধরনের হোটেলের সামনে এসে থামে সিএনজি। সব হারিয়ে পেছনে ফেলে আসা শুভা আর কোনো কিছুতেই ইতস্তত করে না। হালকা খাওয়া দাওয়া করে একটা কক্ষে ঘুমিয়ে পড়ে সে। মাঝরাতে ঘুম ভাঙে। কিছু বুঝে উঠার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটি। প্রথমে বাঁধা দিতে চায়। মধ্যবয়সী আসগর আলীর সাথে শক্তিতে পেরে উঠে না। হার মানে শুভা। পরে নাম পরিবর্তন করে শুভা থেকে বিপাশা। সপ্তাহখানেক পর বুঝতে পারে,তার দলে আরো অনেকে আছে। শিউলি, মরিয়ম, তুলি, নাবিলা, প্রিয়া…


৩.

সাড়ে আট হাজার টাকা বেতন পাওয়া মিথুনের গল্পটা অন্য সব করুণ গল্পের মতোই। ছোটবেলায় বাবা মারা যায়। মা নতুন করে বিয়ে করে। নতুন মায়ের সংসারে ক’দিন যাবার পরেই মামার বাড়িতে থিতু হয়। মামা-মামীর খোটা দুর্ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়ে চলে যাচ্ছিল বেশ ভালোভাবেই। মাঝে প্রায় সমবয়সী মামাতো বোনের সাথে একটু সখ্য হয়েছিল। আড়ালে গিয়ে কথা বলা,একটু-আধটু হাট ধরা, বার তিনেক চুড়ি আর ফিতে কিনে দেওয়া। সেই মামাতো বোনের বিয়ের পরদিনই গ্রাম ছেড়েছিল মিথুন। কাউকে না বলে। মামা মামী কিছু বুঝতে পেরেছিল কিনা কে জানে! নইলি পড়াশোনায় এত ভালো থাকা ষোড়শী মেয়েটাকে বিয়ে দেওয়ার কোন যুক্তিই খুঁজে পায় না মিথুন।


৪.

মাঝরাতে দরজায় টোকা পড়ে। আসগর আলীর গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যা বিপাশা। বিপাশা আগেই তৈরি ছিল। পাতলা গোলাপী শাড়িটায় বিপাশার শরীরের প্রতিটা বিপজ্জনক বাঁক স্পষ্ট। গভীর সমুদ্রের মতো ফর্সা নাভিটা একেবারে যেন নিখুঁত। চোখ ফেরানো যায় না এমন। মুখে গাঢ় করে লিপস্টিক দেওয়া। বেলী ফুলের এক মন মাতানো গন্ধে মৌ মৌ করছে বিপাশার প্রতিটি কাম জাগানো অঙ্গ। সুঢৌল স্তনদুটো পর্বতের ন্যায় উদ্ধত ভঙ্গিতে নিজের জানান দিচ্ছে। ঘরের লাল নীল ডিম লাইটগুলো জ্বালিয়ে দেয় সে।

একটু পর অতিথি আসে। দু’জন। দু’জনেরই বয়স কাছাকাছি মনে হয়। সদ্য তারুণ্য উতরিয়ে যুবকের ছাড়পত্র পাওয়া এমন। বেশ আকর্ষণীয়। বিপাশার বুক ঢিপ ঢিপ করে। সে একা অনেক হায়েনাকে সামলেছে। কিন্তু কখনো দু’জনকে একসাথে সামলে নি। আসগর আলীও আগে কিছু বলেনি। বুক ফেটে কান্না আসতে চাইছে তার। হায়েনারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। ক্ষতবিক্ষত করে দেয় পর্বতসম বুক,সমতল,উঁচু-নিচু উর্বর ভূমি। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে। হায়েনারা আরো জোরে চাপ দেয়। গতি বাড়ায়। একসময় নিস্তেজ হয়ে আসে।

বেশ কিছুক্ষণ পর প্যান্ট শার্ট পরে ভদ্র মানুষের মুখোশ লাগিয়ে বিপাশাকে পাঁচশ টাকার নোট ছুঁড়ে দেয়। ঘৃণায় বিপাশা মুখ নামিয়ে নেয়। তারপর অনেক কষ্টে বিছানা থেকে উঠে পাঁচশ টাকার নোটটিতে একগাদা থু থু ফেলে, জানালা দিয়ে বিশেষ অতিথিদের দিকে ছুঁড়ে মারে। অতিথিরা এর অনেক আগেই পেরিয়ে যায়। একদলা থু থু লাগানো পাঁচশ টাকার নোটটি উড়ে গিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে।


৫.

একঘন্টা শেষ হতে বেশি দেরি নে। মিথুন তাড়াতাড়ি পা ফেলে আনোয়ার মামার দোকানের দিকে। একটা কড়া চা খেতে হবে, সাথে ডার্বি। তারপর জর্দা ছাড়া পান।

চা-সিগারেট খাওয়ার পর আনোয়ার মামা পান দেয়। মুখভর্তি জমে যাওয়া পানের পিক ফেলতে গিয়ে কয়েক ফোঁটা নিজের প্যান্টে পড়ে। কালো সুতির প্যান্টটাও কেমন অভুক্তের মত লাল পিকগুলো শুষে নিচ্ছে দ্রুত। মিথুন এদিক ওদিক একটা কাগজ খুঁজে দ্রুত। পায় না। একটু এগিয়ে আসে। হঠাৎ একটা পাঁচশ টাকার নোটের উপর চোখ পড়ে তার। এদিক ওদিক তাকিয়ে ভালভাবে পরখ করে নেয়, কেউ এদিকে আসছে কিনা। তারপর নোটটা তুলে নেয়। নোটে লেগে থাকা থু থু পরিষ্কার করে। মিনিট দশেক এদিক ওদিক ঘোরে উদ্দেশ্যহীনভাবে। টাকার খোঁজ করতে কেউ আসে না।

একসময় মিথুন বীরদর্পে পাঁচশ টাকার নোটটা আনোয়ার মামার দিকে এগিয়ে দেয়। তারপর বলে, মামা, আগের পাওনাসহ নিয়ে নাও। আনোয়ার মামা দুইশ পঁয়ত্রিশ টাকা রেখে বাকিটা ফেরত দেয়। বাকি টাকা নিয়ে মিথুন হাঁটতে থাকে। পাশেই বদরুদ্দীন শাহ (র) এর মাজার। দান বাক্সে একটা একশ টাকার নোট গুজেঁ দেয়। তার এক ঘন্টা ছুটি শেষ। আজ সে একটু দেরি করে যাবে। আল মদিনা হোটেলে গিয়ে কাচ্চি অর্ডার দেয়। ১২০ টাকার কাচ্চি। সাথে একটা ছোট সাইজের জালি কাবাবও দেয়। হোটেলের বয়টাকে ডেকে এনে এক গ্লাস বোরহানি দিতে বলে। তারপর তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া শেষ করে হোটেলের বিল দেয়। হোটেলের ছেলেটিকে ডেকে ২০ টাকা বকশিসও দেয়। তারপর ভালো একটা পান খেলে ভালো হতো। আবার সে হাঁটতে থাকে আনোয়ার মামার দোকেনের দিকে…

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]