এক মধ্যবিকেলে আমি তার মুখোমুখি হলাম। সাধারণত দিনের বেলার ঘুম সেভাবে গভীর হয় না। কিন্তু সেদিন আমার চোখে গভীর ঘুম। আমার মনে হচ্ছিল কতযুগ কতকাল ঘুমিয়ে আছি আমি। এই ঘুমের মধ্যেই পেরিয়ে গেছে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস। কত রাজা মুকুট হারিয়েছে। কত সভ্যতা বিলীন হয়েছে। অথচ ঘুমের রাজ্যে আমি যেন এক নীল প্রজাপতি। সে আমার মাথার পাশে বসে আছে। তার আলতো ছোঁয়ায় আমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে বার বার। ধীরে ধীরে সে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আমি আমার ভারী চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। কখনো আবার চোখ বন্ধ করে নিস্তব্ধতায় হারিয়ে যাচ্ছি। হয়তো কিছু একটা বলার জন্য তার ঠোঁট কেঁপে উঠলো। অস্থির হলো তার চারপাশ। জানালার পর্দাগুলো দুলে উঠলো। একটা কুটুম পাখি ডেকে উঠলো আবার। এতদিনের জমানো সবকথা আমি একবাক্যে কীভাবে তার কাছে প্রকাশ করি। কিছুই বুঝে পাচ্ছিলাম না। বুকের ক্ষতগুলো তখনো দগদগে হয়ে আছে। মনে হলো আকাশে মেঘের ঘনঘটা। মেঘের গর্জন কানে এলো। কোথায় যেন একটা বজ্রপাত হলো। কিছু সময়ের মধ্যে মাতাল হাওয়ায় আমার সমস্ত ঘর ভরে গেল। বন্ধ চোখ খুলে আমি একভাবে অনেক সময় তার দিকে তাকিয়ে আছি। সে কী! কোথায় সে?

অথচ তখনো আমাদের দেখা হয়নি। আমার মনে হয় এই যে দেখা না হওয়াটা মিথ্যে। আমি ইচ্ছে করেই এসব কথা বানিয়ে বলি। অনেক পথ তার সাথে হেঁটেছি আমি। আমাদের সাধারণ বিষয়গুলো আমরা ইচ্ছে করেই সাধারণ করে রেখেছি। আমার ভাবনার জগতে সে একটা উড়ালপাখি। উড়ে বেড়ায় ঘুরে বেড়ায়। আমার ঘর আমার উঠোন। আমার ফুলের বাগানে তার অস্তিত্ব টের পাই আমি। মা বলতো আমি নাকি অন্যরকম হয়ে যাচ্ছি। আমায় নাকি পরীতে ধরেছে। সত্যই কী আমাকে একটা পরী ধরেছে। যার সাথে আমি সব সময় কথা বলি। মত বিনিমিয় করি। অথবা আমি যার কথা বলছি, তেমন কেউ নেই আমার। তেমন কারো সাথে কথা বলি না আমি। আমি আমার সাথেই কথা বলি প্রতিদিন। আমার মধ্যেই একটা জ্বীন আছে। একটা পরী আছে, যে আমায় তাড়িত করে।

এই এতটা সময় আমি যার কথা বলছি। সে একটা শিল্পীর আঁকা ছবির নাম। সেই ছবিটাকে আমি নানা বর্ণিল সাজে দাঁড় করাই। সে যদি আমার প্রেমিকা হতো তবে কেমন আচরণ করতো, সেসব কথা বার বার ভাবি আমি। কেমনভাবে তার সাথে আমার ভাব-ভালোবাসা হতো। এই সমস্ত বিষয় আশয় থেকে আমি বেরুতে চাই না।  আমার ভাবনাতেই থাকতে চাই আমি। যে ভাবনা সত্যের মতো অথচ সত্য নয়। আমি ধরেই নিতে পারি, এমন একটা ঘটনা ঘটেছিলো আমার জীবনে। যে ঘটনার কথা এখন বলবো  আমি।

তার সাথে সত্যি সত্যি প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিলো। সেদিনকার চারদিকের থমথমে পরিবেশটা এখনো চোখে ভাসে আমার। কত উৎকণ্ঠা পেরিয়ে। কতদিনের অপেক্ষার পর! কত আয়োজন শেষে, আমরা সম্মত হয়েছিলাম, একটা বিকেল আমরা একসাথে কাঁটাবো। পথের ধারে বসে ফুচকা খাবো। পার্কে পাশাপাশি কিছু সময়ের জন্য বসে থাকবো। আলতো করে ওর হাত ছুঁয়ে দিবো আমি। অথবা দূর কোনো অজানায়া ছুটে যাব আমরা। দিগন্ত পেরিয়ে দূরে। অথবা এই শহরের বস্তির কোনো এক খুপরি ঘরে। আমাদের প্রথম দেখার ক্ষণ হবে। ফোনে কথা বলার পর থেকেই আর  আমার চোখে কিছুতেই ঘুম এলো না। দু-হাত দিয়ে কিছুতেই সময়গুলো সরাতে পারছিলাম না। একটা অন্যরকম অনুভূতি আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছিলো। বার বার আমার জলের তৃষ্ণা পাচ্ছিল। বিছানা ছেড়ে জানালার একটা অংশ খুলে দিলাম আমি। তখন মধ্যরাত। আরো কিছুক্ষণ ফিসিফিস করে কথা বললাম আমরা। ওর ধীর-স্থির কথা বার্তায় হয়তো মুগ্ধতা ছিলো। ওর সমস্ত ব্যাকুলতা টের পাচ্ছিলাম আমি। মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ এসে আমাকে ক্লান্তির ঘোর এনে দিচ্ছিল।

একই শহরে থাকি আমরা। ইচ্ছে করলে প্রতিদিন কয়েকবার দেখা হতে পারে আমাদের। কিন্তু এতদিন আমরা কেউ সম্মত হতে পারিনি। ব্যক্তিগত বহুবর্ণিল বাধা ছিলো আমাদের। কিছু কিছু রহস্যময়তা ছিলো। ভাবনায় ছেদ পরার ভয় ছিলো। আর হারানোর ভয় আমাদের মাঝে মাঝে কাঁটাতারের বেড়ার মত সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমরা আরো বেশি বিশ্বাসযোগ্য হতে চেয়েছিলাম। নিজেদের ছোট ছোট সুখ-দুঃখের ভাগিদার হতে চেয়েছিলাম। এক হেমন্ত, এক বসন্ত, এক বর্ষা পরিয়ে আমরা আবার শরৎ-এর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলাম। দেখা হবার সব ব্যাকুলতা ছিলো আমাদের। সে সময় আমার বার বার মনে হচ্ছিল আমাদের দেখা হওয়া প্রয়োজন। কম করে হলেও একবার! হয়তো এই দেখা হবার পর! হয়তো একবার তার কাছে যাবার পর। আমার কল্পনার আল্পনায় আঁকা মানুষটার সাথে বাস্তব মানুষটার কিছু কিছু অমিল দেখতে পাব আমি। কিছু ভিন্নতায় কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে যাব আমি।  অথবা কোনো কিছুই ভাববো না আমি। একবার দেখা হবার ক্লান্তির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবো। হয়তো এই দাঁড়িয়ে থাকার সময় হবে হাজার বছর। এই অপেক্ষার সময় হবে হাজার বছর। তবুও আমাদের দেখা হওয়া প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু সেই শরতে আমাদের আর কিছুতেই দেখা হলো না। অতঃপর আবার অপেক্ষা আমাদের।

ভোট ও ভাতের অধিকার নিয়ে ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষগুলো বরাবরই বেশি কথা বলে। বরাবরই তারা অন্যদের জানান দেয় তাদের ব্যবস্তার খবর। আর নির্বাচনকালীন দর হাকাহাকি, কথা কাঁটাকাটি তো লেগেই থাকে। তখনো কোনো পক্ষই সম্মত হতে পারেনি। কোনো পক্ষই সর্বসান্ত্বনার বাণী সবার মাঝে তুরে ধরতে পারেনি। কোথায় যেন একটু অমিল ছিলো। কোথায় যেন একটা বিভক্ততার চিহ্ন ছিলো। নির্বাচন হওয়া আর না হওয়া নিয়ে যখন বড় সংশয় চলছে। রাজপথে বেরুতে মানুষ যখন ভয় পাচ্ছে। তারপরও বাস চলছে, ট্রেন চলছে। রাস্তায় রিক্সা, অটো চলছে। স্কুল কলেজ চলছে। চাকুরিজীবিরা তাদের চাকুরি স্থলে যাচ্ছে। রাস্তার ধারে ফুটপাতে দোকানীরা বসে বসে ব্যবসা করছে। আর এরই মধ্যে কোথাও কোথাও আগুন জ্বলছে। বোমা ফুটছে। বাস পুড়ছে। এমনই একদিন আমাদের দেখা হবার ক্ষণ ছিলো।

শীতের তীব্রতার ভিতর এক মধ্যদুপুরে আমরা ঘর থেকে রেরুলাম। এই শহরের অসংখ্য পার্ক রেস্তোরার, যে কোনো একটা স্থান হতে পারে। আমার ইচ্ছের সাথে তার কোথায় যেন অমিল দেখতে পেলাম আমি। মাঝে মাঝে তো এমন হতেই পারে। সব সময় সকল ক্ষেত্রে মিল-অমিলের বিষয়টা আমাদের লেগেই ছিলো। অবশেষে ঠিক হলো খোকনপার্কের সামনে দেখা হবে আমাদের। হয়তো ওর চেয়ে কিছু সময় পূর্বে আমার রিক্সা সেখানে পৌঁছেছিলো। সে কারণে আমার ছিলো অপেক্ষার সময়।

রাস্তায় তেমন একটা ভিড় ছিলো না সেদিন। আমি বার বার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলাম। কিছু সময় পর আমার সামনে একটা রিক্সা এসে দাঁড়ালো। আমাদের পাড়ার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটাকে রিক্সা থেকে নামতে দেখলাম আমি। কিছুটা অবাক অথবা হতবাক কিছুই হয়নি আমি। হয়তো শতবার দেখা হবার জনের সাথে অচেনা হয়ে থাকার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম। আমার তো এমনই হয় জীবনে। চেনা মানুষগুলো অচেনা হয়ে থাকে। সামান্য দূরে সাতমাথায় মিছিলের আয়োজন চলছিল। কিছু সময়ের মধ্যে একটা মিছিল এদিকেই এগিয়ে এলো। তখন মিছিলকারীরা আর আমরা একেবারে সামনা-সামনি। কিছু সময় পর কারা যেন মিছিল লক্ষ করে খোকনপার্ক থেকে কয়েকটি বোমা ছুঁড়ল। দিক-বিদিক ছুটোছুটি আমাদের। কয়েকজনকে রাস্তায় লুটিয়ে পড়তে দেখলাম। কী করবো কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না! মনে হলো কুয়াশায় ঢেকে আছে চারধার। চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখি, কয়েকজন মিলে রীতাকে ধরাধরি রিক্সায় তুলছে। রীতার রক্তে ভেজা সবুজ শাড়ি দেখে চমকে উঠি আমি। তখন আমার মনে হয়, তার শরীরে কোন শাড়ি নেই। কোনো রঙ নেই , কোনো রক্ত নেই। তার বুকে জড়িয়ে আছে একটি লাল সবুজের পতাকা।

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]