হাঁস দুটো এইমাত্র জবাই করা হয়েছে। এখনো রক্ত ঝরছে। টকটকে লাল রক্ত। নজু মেম্বার নিজ হাতে কাজটা করেছেন। দুটো হাঁসেরই চোখ খোলা। সেই খোলা চোখে করুণ দৃষ্টি দিয়ে নজু মেম্বারকে দেখছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঁস দুটোর দেহ শান্ত হয়ে যাবে। তবে তার আগে তার ঘাতককে সে শেষবারের মত দেখে নিচ্ছে। নজু মেম্বারের কাছে এটা নতুন কিছু না। এরকম চোখ সে আগেও দেখেছে। একজন দুজন করে অনেকের চোখ। করুণ। বাঁচার আর্তি ছিল সে চোখে। বহু বছর আগে। সেই যেবার দেশে যুদ্ধ বাধলো। স্বাধীনতার ডাক দিল শেখ মুজিব। সেই সময়। গ্রামে গ্রামে পাকিস্তনি সেনারা ঢুকে গেল। নজু মেম্বারের গ্রামেও এলো। ময়মনসিংহ জেলার মহেশখালি গ্রাম। সবেমাত্র শহরে যাবার পাকা রাস্তা হয়েছে। দু একটা গাড়ি চলাচল করে। একদিন সেই রাস্তা দিয়ে হুশ করে কয়েকটা মিলিটারি জিপ উপস্থিত হলো। গ্রামে তখন যুবক কেউ নেই। যে দু একজন আছে তার নজু মেম্বারের সাথে সাথে থাকে। গ্রাম পাহারা দেয়। হিন্দুদের হুমকি ধামকি দেয়। গ্রাম ছাড়ার ভয় দেখায়। অনেক হিন্দুই সে ভয়ে ওপার চলে যায়। কেউ কেউ নজু মেম্বারের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেও থেকে যায়। এসব সাহসী মানুষের মধ্যে একজন নরেন মাস্টার। মিলিটারি জিপ সোজা গ্রামে স্কুল মাঠে গিয়ে থামে। সেখানে পাকিস্থানি পতাকা আগে থেকেই উড়ছিল। নজু মেম্বারের লোকজন উড়িয়ে রেখেছিল। স্কুলের হেডমাস্টার নরেন বাবু স্কুলের পাশেই থাকেন। স্কুল বন্ধ থাকলেও নিজে প্রতিদিন সকালে এসে অফিস রুম ঝাড় দেন, টেবিলটা নিজ হাতেই মোছেন। তারপর কিছুক্ষণ নিজের চেয়ারে বসে থাকেন। ঘন্টা দুয়েক পর আবার তালা দিয়ে চলে যান। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটাই রুটিন। সেদিনও তিনি তার রুমে বসেছিলেন। তখনি পাকিস্থানি জীপ গাড়িটা ঢোকে। নরেন মাস্টার ঘটনা কি দেখার জন্য বারান্দায় এসে দাড়ায়। চশমার ভেতর দিয়ে তাকিয়ে দেখে সারা স্কুল মাঠে পাকিস্থানি সৈন্য। স্কুলের বরই গাছ তলায় দাড়ানো অফিসার মত একজন নরেন মাস্টারকে দেখে। অফিসারটি নিজেই তার দিকে এগিয়ে যায়। হেডমাস্টারের সাথে পাকিস্থানি অফিসারটির কিছু কথাবার্তা হয়।

তুমি কে?

আমি এই স্কুলের হেডমাস্টার। নরেন মাস্টার।

হেডমাস্টার! তুমি চাও এদেশ হিন্দুর দখলে যাক?

জ্বী না। আমি চাই এদেশ স্বাধীন হোক।

তুমি হিন্দু?

জ্বী স্যার আমি হিন্দু।

ইন্ডিয়া যাও নাই।

না। ওটা আমার দেশ না।

তাহলে তোমার দেশ কোনটা?

এটা। এই বাংলাদেশ। জয় বাংলা।

জয় বাংলা বলা শেষ হওয়া মাত্রই নরেন মাস্টারকে সেই বারান্দাতেই গুলি করে মারে। নজু মেম্বারের কাছে খবর ছিল মিলিটারী আসার। মিলিটারী গ্রামে এনেছে সে। গ্রামে অতি উৎসাহী ছেলেদের নিয়ে সে ইতোমধ্যেই রাজাকার বাহিনী গঠন করেছে। বেশ কিছু জায়গা জমিও দখল করে ফেলেছে। সে এখন গ্রামের বড় জোতদার। মাত্র ক’দিন আগেই যে সরকার বাড়ির কাজের লোক ছিল রাতারাতি সে বাড়ির অনেক জমির মালিক হয়ে গেল। সরকার বাড়িতে অবশ্য তেমন কেউ থাকে না। সবাই ঢাকায় থাকে। যুদ্ধ শুরুর পর কেউ আর গ্রামে আসেনি। বড় সরকার আর তার বউ থাকে। প্রচুর জমিজমা, পুকুর আর বাগান সরকার বাড়ির নামে। দশজন নিয়মিত এসব দেখাশোনা করে। ফাইফরমাশ খাটে। নজুও এরকম একজন। যুদ্ধ শুরুর পর পর নজুর কাজকর্ম পাল্টে গেল। পুকুরের মাছের হিসাব সে দেয় না। জমির ধানেরও না। কিভাবে কিভাবে যেন তার নামের সাথে মেম্বার শব্দটা যোগ হয়ে গেল। দুচারজন তার পিছে পিছে ঘোরা আরম্ভ করলো। পোশাক পাল্টে ফেললো নজু মেম্বার। ঠিকমত সরকার বাড়ির কাজকর্মও করে না। একদিন সন্ধ্যায় বড় সরকার তাকে ডেকে পাঠালো বড় সরকার।

তুমি নাকি ঠিকমত কাজ কাম কর না নজু?

নজু কথা না বলে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি তুলছে। কেউ সরকার বাড়ির কারো দিকে তাকিয়ে কথা বলে না।

‘গেরামে নাকি পাকিস্থান বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য দল বানাচ্ছো।’

‘ঠিক শুনছেন চাচা। পাকিস্থানের জন্য জান দিবার পারি’

‘আমার জমি টমি নাকি দখল নিতাছ?’

‘এত জমি দিয়া করবেন কি?’

বড় সরকারের রাগে গা জ্বলতে থাকে। কয়েকদিন আগেও যেখানে বড় সরকারের মুখের ওপর কথা বলার সাহস হয় নাই আজ সে বেয়াদপের মতো কথা বলে।

‘আমার বাড়ি থেইকা বাইর হ হারামজাদা। বাইরর হ কইলাম। তর মুখ য্যান আর না দেখি।’

নজু মেম্বার কোন কথা না বলে সরকার বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। বাইরে এসে সরকার বাড়ির দিকে ফিরে বলে ‘নজুরে অপমান করস? হারামজাদা তোরে আমি খাইছি?’

নজু মেম্বার আর সে বাড়িতে কোনদিন যায়নি। এখন নজু মেম্বার গ্রামের ক্ষমতাবান ব্যক্তি। সবাই তাকে দেখে সালাম দেয়। সে এখন বিরাট রাজাকার। নিজ উদ্যেগেই হিন্দুদের বাড়িঘর দখলে নিয়েছে। এগুলো দখল করা নাকি তার দায়িত্বের মধ্যে পরে। কেউ টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস পায় না। পাছে নজু তার বাড়িঘরে হামলা করে। তার দলেও এখন অনেকে যোগ দিয়েছে। টাকা পয়সা, খাওয়া দাওয়ার কোন চিন্তা নাই। পাকিস্থানকে রক্ষা করতে হবে। গ্রামে একটাও হিন্দু এজেন্ট থাকতে দেয়া যাবে না। তারপর যখন দেখলো তার কথায় মানুষের ভয় কমে এসেছে তখন পাশের গ্রামে গিয়ে পাকিস্থান সেনাবাহিনীকে খবর দিয়ে এলো। এ গ্রামে নাকি মুক্তিযোদ্ধারা এসেছে। পাশের গ্রামের স্কুলেই ছিল পাকিস্থান সেনাবাহিনীর ক্যাম্প। সে একটা পাকিস্থানী পতাকা হাতে ধরে খুব ভয়ে ভয়ে ক্যাম্পে ঢুকলো। তার ধারণা ছিল মিলিটারীরা তাকে বাধা দেবে। কিন্তু কেউ কিছুই করলো না। কেবল তার দিকে সতর্কভাবে তাকিয়ে দেখলো। মনে হয় হাতে পতাকা থাকায় কেউ কিছু জিজ্ঞ্যেস করেনি। নজু মেম্বার একজন সৈনিকের কাছে উর্দুতে জানতে চাইল, ‘মেজর সাহেব কোথায়?’ সৈনিকটি ইশারায় তাকে একটি কক্ষ দেখিয়ে দিলো। সেই কক্ষের বাইরে দুজন পাহারা দিচ্ছিল। একজন কেবল জানতে চাইলো, ‘কাকে চাই?’ ‘মেজর সাব কা।’ মেজর সাহেবের কক্ষে ঢুকেই বললো ‘পাকিস্থান জিন্দাবাদ।’ মেজর সাহেব তাকে ইশারায় বসতে বললো। মেজরের সাথে তার কিছু কথাবার্তা হলো। কথাবার্তা চললো একজন দোভাষীর মাধ্যমে।

তোমার নাম?

‘নজু স্যার।’

‘তুমি পাকিস্থান ভালোবাসো?’

‘জ্বী জনাব।’

‘তোমার গ্রামে মুক্তি আছে?’

‘সেই খবরই দিতে এসেছি স্যার।’

‘খুব ভালো।’

‘তোমার গ্রামে হিন্দু আছে?’

‘আছে স্যার।’

“হিন্দু মেয়ে আছে?’

‘খুব সুন্দর মেয়ে আছে স্যার।’

‘খুব সুন্দর?’

‘জ্বী স্যার।’

‘প্রতিদিন একটা করে পাঠাতে পারবে?’

‘জ্বী স্যার পারবো।’

‘তাহলে তোমার গ্রামে যাবো। তোমার গ্রামে কোন মুক্তি থাকবে না।’

বের হওয়ার সময় আরেকবার গলা তুলে ‘পাকিস্থান জিন্দাবাদ’ বলে স্কুল থেকে বেরিয়ে আসে। পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলার সময় গলার স্বর এত জোড়ে হয় যে নজু মেম্বার নিজেই চমকে ওঠে।

এর পরেই এ গ্রামে পাকিস্থান বাহিনী ক্যাম্প করে। ক্যাম্প করার পর থেকে নজু মেম্বারের দাপটও বেড়ে গেছে। আজকাল সবার বাড়িতেই ঢুকে অত্যাচার করে। সরকার বাড়ির সবাইকে নিজ হাতে জবাই কওে মেরেছে নজু মেম্বার। কথা না শুনলেই জবাই করে ফেলে রাখে। যুদ্ধেও একেবাওে শেষ দিকে এই গ্রাম হানাদার মুক্ত হয়। আর নজু মেম্বার গ্রাম থেকে গা ঢাকা দেয়। তারপর একসময় পরিস্থিতি শান্ত হলে অন্য রাজাকারদেও সাথে গ্রামে ফেরে। ততদিনে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। দেশের স্বাধীনতাবিরোধীরা আস্তে আস্তে বুক টান করতে শুরু করেছে। নজু মেম্বারকে আর অনকেই নজু মেম্বার বলে না। পথে ঘাটে দেখা হলে অনেকেই বলে নজু রাজাকার না? কবে গ্রামে ফিরছ? হারামজাদা! গাল খেয়ে গাল হজম করার অভ্যাস হয়ে গেছে। এসব তার কাছে কোন বিষয় না। বিষয় হলো তার দখল করা সম্পদ। তবে তার সম্পদেও পরিমাণ কমেনি। দখল করা সেসবের বেশিরভাগই তার দখলে। ধীরে ধীরে গ্রামে তার প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। তারপর একদিন নজু রাজাকার সত্যি সত্যি নির্বাচনে দাড়িয়ে যায়। তার থেকেও অবাক করা বিষয় হলো ভোটে জিতে সে গ্রামের মেম্বারও হয়ে যায়।

হাঁস দুটো জবাই করার সময় হঠাৎ সেসব দিনের কথা মনে পরে যায় নজু মেম্বারের। কাটা হাঁসের চোখের মতো বহু করুণ চোখকে সে উপেক্ষা করেছে। হাঁস দুটো এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। তবে এখন চোখ দুটো একটু ঘোলা। তবে সেই ঘোলা চোখেও দেখছে নজু রাজাকারকে। সেই দৃষ্টি পাথরের; ঘৃণা মেশানো।

লেখক পরিচয়

অলোক আচার্য
অলোক আচার্য
Latest entries
[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]