চিলাহাটি থেকে লোকাল ট্রেনটা সৈয়দপুর স্টেশনে থামতে না থামতেই খড়ির বোঝাটা তড়িঘড়ি ট্রেন থেকে ফেলে দেয় রাহেলা। নামতে দেরী হলে যাত্রীরা খ্যাক খ্যাক করে ওঠে। কেউ ভীড়ের ছলে কেউ না দেখার ভান করে বেজায়গায় ধাক্কা দেয়। মাংস থেতলে নেমে যায় হুটহাট । তাই সে আগে ভাগে বোঝা ফেলে দিয়ে নেমে যায় চলন্ত ট্রেন থেকে।

রাহেলা ছেড়া শাড়িটা কোনমতে টেনেটুনে কোমড়ে গুজে দেয় আঁচলটা। কিন্তু শতচ্ছিন্ন শাড়ি ভেদ করে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার সুগঠিত শরীর। শত অভাবের মধ্যেও কমে না শরীরের তেজ। হাজারো বুভুক্ষু চোখ  চষে বেড়ায় তার পচিশোর্ধ শরীরের রূপালি ভাজে।

রাহেলা সাহেরার বোঝাটাও নীচে ফেলে দেয়। সাহেরা বিধবা। বয়সের ভারে ক্লান্ত সাহেরা ভর করে চলে রাহেলার উপর। বোঝা টানতে কষ্ট হয় তাই রাহেলা সব কাজে তাকে সাহায্য করে।

খড়ির বোঝা মাথায় তুলতেই টিটি এসে পথ আগলে দাঁড়ায়। হম্বিতম্বি করে টিটি বলে, এই বেটি পয়সা দিয়ে যা।

পয়সা কোত্থেকে দেবে! এরা টিকিট ছাড়াই যাতায়াত করে নিত্যদিন। বন জঙ্গল থেকে ডালপালা কেটে এনে কোনমতে সংসার চালায়। এখন ঝোপঝাড়ও শেষ। আগের মতো গাছ-গাছালি নেই। একদিন কাঠ আনলে সাতদিন খবর থাকে না।

রাহেলা টিটিকে বলে, এই সাতসকালে পয়সা কোনঠে পাইম বাহে? খড়ি ব্যাছে কালকে পয়সা দেইম।

– কালকের-টা কালকে। এখন পয়সা দাও। এর আগেও দাওনি। এটা কি বাবার ট্রেন পেয়েছ?

– স্যার, সত্যি কওছো একটা ফুটা পয়সা নাই। কাইল দিয়া দেইম।

– মাতারী এখন পয়সা দিবি, বলে খেকিয়ে ওঠে টিটি।

– স্যার, আল্লার কসম লাগে, কাইলে টাকা দিয়া দেইম।

রাহেলা আঁচল খুলে ঝাড়া দিয়ে দেখায়। পয়সাতো নেই উপরন্তু স্পষ্ট হয় তার শাড়ি ও শরীরের ভৌগলিক অবস্থান।

ট্রেন ছেড়ে দেয়ার উপক্রম হয়। টিটিও জানে এরা হতদরিদ্র। হাজার টানাহ্যাচড়া করলেও এক পয়সা দিতে পারবে না। ট্রেন ছেড়ে দিলে অগত্যা টিটি দৌড়ে গিয়ে ট্রেনে ওঠে।

স্টেশন থেকে আধা মাইল দূরে খড়ির হাট। পরিত্যক্ত রেল লাইনের উপর বসে এই অস্থায়ী বাজার। চারিদিকে হরেক দোকান। থাল বাসন, ডেকচি, ভাঙ্গারীর আড়ৎ। তার মাঝে লাইনের উপর চলে এই লাকড়ির বেচাকেনা।

রাহেলা সাহেরার মতো আরো অনেক বিধবা স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ে ব্যস্ত এই জীবন সংগ্রামে। দশ পনের মাইল দূর থেকে ট্রেনে করে নিয়ে আসে এই বোঝা। কেউ মাথায় করে কেউ ভ্যানে করে আনে জীবনের এই দায়। বড় নির্মম, বড় রুক্ষ এই দরাদরি।


দুই

দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে আসে। এখনো বেচতে পারেনি এক বোঝাও। কাস্টমার পরখ করে, দামের বেলায় ভেজা বিড়াল। পেট চো চো করে দু’জনারই।

এমন সময় মধ্যবয়সী একজন এসে জিজ্ঞেস করে রাহেলাকে, এই তোমার খড়ির দাম কত? এগুলা কী কাঠ?

– পাঁচমিশালী কাঠ বাহে। জিগা আছে বট আছে পাখর আছে, সব মিলাঝুলা কাঠ। রাহেলা চটপট জবাব দেয়।

– এগুলা তো জ্বলবে না। চুলায় ধুয়া হবে।

– কায় কইছে জ্বলবে না? রইদোত শুকি ঝনঝনা হয়া গেইছে, দ্যাখেন না?

– দাম কত? লোকটা খড়ির দিকে না তাকিয়ে রাহেলার শরীরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলে।

এই দৃশ্য নতুন নয় রাহেলার জীবনে। কৈশোর থেকে যৌবন অবধি চলছে এই ট্যারা চোখের কসরত। কখনো কুদৃষ্টিতে কখনো লালসার স্রোতে ভাসতে ভাসতে আকড়ে ধরেছে এই বেঁচে থাকার খড়কুটো। তবুও পাছ ছাড়ে না এই নগ্নতার আমন্ত্রণ ।

রাহেলা কিঞ্চিৎ রুক্ষভাবে বলে– দশ টাকা।

– তোমার মাথা নষ্ট? দশ টাকা! পাঁচ টাকায় কত ভালো খড়ি পাওয়া যায়। পাঁচ টাকায় দিবে?

– নাহ।

– ছয় টাকা?

– নাহ।

রাহেলা অনঢ় থাকে।

লোকটা আরো কিছুক্ষণ দরদাম করে চলে যায়। যাবার আগে রাহেলার শরীরে আরেকবার লেহন করে তার নগ্ন চোখের নড়াচড়া ।

রাহেলা দেখে বাজারে অনেক খড়ির আমদানি। বেটা ছয় টাকা খারাপ বলেনি। অন্য কেউ ছয় টাকায় নিতে রাজী হবে না। কেবল তাকে দেখে ঝোঁকে ঝোঁকে সে দাম বাড়িয়ে বলেছে।

রাহেলা ভাবে খড়ি বিক্রি করলেই ভাল ছিল। বেটা না আসলে এই খড়ি কখন বিক্রি হয় কে জানে। সময়মত বেঁচতে না পারলে বাড়ি ফিরতে হবে রাত বারোটার ট্রেনে। তখন রাস্তা ঘাটে লোকজন থাকে না। শিয়াল কুত্তায় ভরে যায়। মাংস খাওয়ার জন্য ছোঁকছোঁক করে।

সে দূর থেকে দেখে লোকটার গতিবিধি। অন্যখানে দরদাম করলেও মাঝেমধ্যে তাকায় রাহেলার দিকে। রাহেলা ডাকে কিনা কিন্তু রাহেলা তাকায় অন্যত্র। একটু পর দেখে লোকটা এদিকে আসছে। রাহেলা সিদ্ধান্ত নেয় এবার খড়ি দিয়ে দিবে।

সে রাহেলার কাছে না এসে সাহেরার বোঝা দরদাম  করে। সাহেরাও সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছে। একজনও কাস্টমার আসেনি। চেহারার টানে রাহেলার কাছে এলেও সাহেরার কাছে তেমন ভীড়ে না কাস্টমার ।

রাহেলা জানে সাহেরার খড়িও ভাল। তার পছন্দও হয়ে যেতে পারে। রাহেলা উসখুস করতে থাকে। দেরী হলে সাহেরারটা নিয়ে ফেলবে। তাই রাহেলা বলেই ফেলে, এই ভাই নিয়া যান।

একথা বলতেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে সাহেরা।

এমনিতে সে রোগী, খিটখিটে মেজাজ।  উত্তপ্ত কণ্ঠে বলে ওঠে, মাগী দেখিস না মোর খড়ি দরদাম কইরছে ?

একজনেরটা দরদাম করলে অন্য বিক্রেতার কথা বলা অন্যায়। তবুও রাহেলা ছাড়ার পাত্রী নয়। সে বলে, ওমরাতো মোর খড়ি দরদাম ঠিক করি গেইছে। এখন দিয়া দেইম। হাকাউ মোক দোষ দেইছিস?

লোকটি এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। রাহেলার খড়িই তার পছন্দ। সে রাহেলাকে বলে, কী সাত টাকায় দেবে?

রাহেলা এতটা আশা করেনি। সে সানন্দে রাজী হয়ে যায়। ওদিকে রাগে গজগজ করতে থাকে সাহেরা। মাগী শরীর দেখায় সাত টাকায় বেঁচলো খড়ি। হামার কাস্টমার ভাগায় নিলো।

রাহেলা ক্রেতাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার বাসা কদ্দুর ব্যাহে?

– বেশি দূর না। বিজলী সিনেমা হলের পিছনে। পাঁচ মিনিটের রাস্তা।

– পাঁচ মিনিটের কথা কয়াতো আধঘন্টা হাটান।

– চিন্তা কোর না বখশিশ দিয়ে দেব।

– বখশিশ দেওয়া নাগবে না। বখশিশ দেওয়া মানুষগুলা খাচ্চর হয়।

– সবাই খারাপ হয় না।

– ব্যাটা মানুষের ভালমন্দ নাই। সবগুলাই খাচ্চরের একশেষ।

জীবনের বেনোজলে হাবুডুবু খাওয়া রাহেলা জানে পুরুষের খাসিলত। এই ছোট্ট জীবনে ইতিমধ্যে দেখেছে

দুই পুরুষের সারাংশ। একটি কুঁড়েঘর, এক সানকি সাদা ভাতের স্বপ্নে সে বারবার ছিন্নভিন্ন হয়েছে। আছড়ে পড়েছে জীবনের ফুটপাতে। ঘরে রেখে আসা শিশু বাচ্চার শুকনা মুখ তাকে টেনে এনেছে এই জটিল সমীকরণে।

বোঝাটা অনেক কষ্ট করে মাথায় তোলে রাহেলা। সাহেরাকে বলে, ভাবী মোর সাথে একনা চল, খড়িটা

নামে দিয়া আসি।

সাহেরার মেজাজ তখনো উত্তপ্ত। রাগে জ্বলছে তার শরীর। সে কর্কশ কন্ঠে বলে, আর ঢঙের কথা কইস না মাগী। মুই গেইলে মোর খড়ি কায় বেঁচবে? তুইতো চালাকি করি ব্যাছে ফেলছিস।

রাহেলা আর কিছু বলে না সাহেরাকে। তার দুঃখ আরো বেশি। শরীর চলে না তবুও ভারী বোঝা নিয়ে আসে। সে না আসলে রাহেলাও একা একা এদ্দুর আসতে পারতো না। সাহেরাই তার বডিগার্ড।


 তিন

লোকটাকে সুবিধার মনে হয় না রাহেলার। তবুও নিরুপায় হয়ে বোঝা মাথায় নিয়ে রওনা হয় ক্রেতার বাড়ি। এই এলাকায় কোন বাড়িতে জানি তার ছোটবোন তাহেরা কাজের মেয়ের কাম করে। রাহেলার বাবাই এনে দিয়ে গেছে। তাহেরার কথা মনে করে রাহেলা কিছুটা স্বস্তি পায়। যদি এখন দেখা হইত বইনটার সাথে!

বিজলী সিনেমা হলের সামনে প্রচণ্ড ভীড়। মানুষে যেন মানুষ খায়। রিকসা সাইকেল চটপটি সব একাকার। ভীড় পার হলে রাস্তাটা ফাঁকা হয়ে যায়। রাহেলা লোকটিকে বলে, আগে আগে হাটো তো তোমরা।

রাহেলা একহাত উচু করে মাথার ভারী বোঝাটা ধরে হাটছে। শরীরের উর্ধ্বাংশ অনেকটাই অনাবৃত। সে বুঝতে পারে তার শরীরে ক্রেতার ক্ষুধার্ত চোখ কিলবিল করে হাঁটছে।

হাঁটতে হাঁটতে লোকটি বারবার পিছন ফিরে তাকায়। নির্জন রাস্তায় তার এই অভ্যাস যেন আরো বৃদ্ধি পায়। রাহেলা অস্বস্তিবোধ করে। সে রাগান্বিত কন্ঠে বলে, বারবার পিছন ফিরে তাকান ক্যান বাহে?

সে নির্বিকার। হাঁটতে হাঁটতে রাহেলাকে বলে, তোমার বাড়িতে কে কে আছে ?

রাহেলার ইচ্ছা করে না জবাব দিতে। কিন্তু বেহায়া মানুষটা আবার জিজ্ঞেস করে।

রাহেলা মিথ্যা করে বলে, সবাই আছে।

– স্বামী আছে না?

– থাকবেনা ক্যান?

– তাহলে খড়ি বেচ কেন?

রাহেলা বিরক্ত হয়। উত্তর দেয়, সখ করি বেচি।

রাহেলার জানতে ইচ্ছা করে এই সময় তার ঘরে কে কে আছে। মহিলা মানুষ আছে তো!

কিছুক্ষণ হাটার পর তারা একটা গলির ভিতর প্রবেশ করে। চারিদিকে চিপা, ঘিঞ্জি ঘরবাড়ি। পাশে বিরাট নর্দমা, দুর্গন্ধে ভরপুর। রাহেলার নাড়িভুঁড়ি গুলিয়ে আসতে চায়। হাত বাঁধা থাকায় নাকে কাপড় দিতে পারে না। বিরক্ত হয়ে বলে, আর কদ্দুর বাহে? এই তোমার পাঁচ মিনিটের আস্তা? মোর মাথা টনটন কইরছে।

এইতো এসে গেছি। লোকটা আশ্বস্ত করে।

আরো দুইটা গলি পার হয়ে এক ভাঙ্গাচোরা বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ায়। আশেপাশে তেমন কোনো মানুষের সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। একটা কুকুর দাঁড়িয়ে আছে যেন অভ্যর্থনার জন্য। কুকুরটা তার কাছে এসে দাঁড়ায়। শরীরের গন্ধ নেয়ার চেষ্টা করে। রাহেলা ভয় পেয়ে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সে দূরে না গিয়ে তার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকে। লেজ নাড়াতে থাকে দূর্বোধ্য ভঙ্গিতে।

লোকটা চাবি দিয়ে ঘটঘট করে তালা খোলার চেষ্টা করে। তালা যেন খোলে না।

রাহেলা অসহ্য হয়ে ওঠে, এইখানে খড়ি ফেলে দিনু। তোমরা পরে ভিতরোত নেন। মোর মাথা নাগি গেইছে।

– একটু কষ্ট করো। একেবারে ভিতরে ফেলে যাও। পয়সা বাড়িয়ে দেব।

লোকটা ধাক্কাধাক্কি করে দরজা খুলে ফেলে। বাসার  ভিতরে ঢুকে বলে, ভিতরে নিয়ে এসো।

রাহেলা বোঝা নিয়ে ভিতরে ঢোকে। ওদের পিছুপিছু কুকুরটাও ঢোকে। লোকটা দরজা ভিড়িয়ে দেয়। রাহেলা যেন নিজের অজান্তে চমকে ওঠে। ব্যাটার কোন কু-মতলব নাই তো?

ভিতরে কোনো লোকজন নেই। সাড়াশব্দও নেই। রাহেলা বোকার মতো বলে বসে, বাড়িত নোকজন নাই?

লোকটা থতমত খেয়ে বলে, আছে আছে।

লোকটা তড়িঘড়ি করে কোনার ঘরটা খুলে দেয়।  দরজা খুলে দিয়ে বলে, আনো আনো খড়িটা ভিতরে আনো।

রাহেলা শরীরটা নীচু করে ছোট দরজা দিয়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে। ভিতরে অন্ধকার। হাস মুরগীর বিষ্টার গন্ধে ভরপুর। রাহেলা গন্ধ সহ্য করতে না পেরে তাড়াতাড়ি করে বোঝা ফেলে দেয় মাটিতে। কিন্তু পরক্ষণে চিৎকার করে ওঠে। পায়ে খড়ির খোঁচা লেগে কাতরাতে থাকে।

রাহেলা অসহ্য যন্ত্রণায় কোনমতে উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু হঠাৎ পিছন থেকে জাপটে ধরে একজোড়া শক্ত বেষ্টনি। তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যায় রাহেলা। তার উপর চেপে বসে একটা ভারী পাথর। ঘন নিঃশ্বাসে ফিসফিস করে লোকটা বলে, দেখি দেখি কোথায় ব্যথা পেয়েছ?

ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে যায় রাহেলা। সম্বিত ফিরে পেয়ে চিৎকার করে ওঠে, ছাড়েন ছাড়েন হামাক…।

রাহেলা ধাক্কা দিয়ে সরাতে চায় লোকটাকে কিন্তু শক্তিতে পারে না। তাকে অসুরের শক্তিতে চিপে ধরে। ক্ষুধার্ত আক্রোশে কামড় বসায় রাহেলার উদ্ধত শরীরে। রাহেলার নিঃশ্বাস যেন আটকে আসতে চায়। সে ফিসফিস করে বলে, তোমাকে অনেক বখশিশ দেব, অনেক।

বখশিশ দিবু হারামির ব্যাটা… বলে রাহেলা তাকে কামড়াতে থাকে, খামচাতে থাকে কিন্তু পারে না সরাতে। ক্রমান্বয়ে হার মানতে থাকে গোখরা সাপের বিষের কাছে। তলিয়ে যেতে থাকে তার কৌলিন্যের অহংকার।

খড়ির ঘরে ধস্তাধস্তির শব্দ মুখর হয়ে ওঠে। ঘেউঘেউ করে ডাকতে থাকে কুকুরটা। অবুঝ পশুও যেন বোঝে এই পশুত্বের অনাচার।

এমন সময় গেটে শব্দ হয়। বাড়ির ভিতর কেউ যেন প্রবেশ করে। দরজা খোলা দেখে অবাক হয়ে যায়।

এক মহিলা কন্ঠ বলে, বাড়ির দরজা খোলা কেন?

এই তুমি খড়ি নিয়ে এসেছ নাকি?

কোথায় তুমি?

লোকজনের শব্দ শুনে রাহেলার শক্তি যেন প্রবল হয়ে ওঠে। সে সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করতে থাকে তার তলপেটে।

শেষে চিপে ধরে তার অন্ডকোষ।

লোকটা চিৎকার করে ওঠে। রাহেলা গর্জন করে বলে, গোলামের ব্যাটা ইজ্জত খাওয়ার সখ? তোমার মাইয়া

নাই?

ভিতরে ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে মহিলা চিৎকার করে ওঠে। কে ভিতরে? কে ওখানে? কিসের শব্দ হয়?

মহিলা ঘরের কাছে এগিয়ে আসে। ঘরে উঁকি দিতেই হতভম্ব হয়ে যায়। দেখে তার স্বামী ও এক অর্ধবিবস্ত্র মহিলা।

রাহেলা ছিটকে বাইরে এসে মহিলার পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, আপাগো হামার সর্বনাশ কইরছে। মুই গরীব মানুষ, মোক কামড়ে হিচড়ে শ্যাস করি দিছে। মোর কি হইবে?

এই বাসায় রাহেলাকে আলুথালু বিধ্বস্ত অবস্হায় দেখে সঙ্গে থাকা তাহেরাও অবাক হয়ে যায়। হতভম্ব হয়ে যায়। তার বোন এখানে কেন?

তাহেরা চিৎকার করে রাহেলাকে জড়িয়ে ধরে। বলে, বুবু তুই? তুই এইঠে ক্যামন করি আলু?

রাহেলা কাঁদতে কাঁদতে বলে, খড়ি বেঁচের আইসছুনু। খড়ি নামাইতে না নামইতে ওমরা জাপটে ধইছে। মোক বেইজ্জত কইরছে।

বড়বোনের এই বেহাল অবস্হা দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে তাহেরা। তার ঘৃনা ধরে যায় লোকটার উপর। তার ছোট মুখও যেন আজ খুলে যায়। সে চিৎকার করে বলতে থাকে, ওমরাতো একটা শয়তান, একটা কুত্তা। মোখো কয়দিন ঝাপটে ধইরছে, বলে ক্রুদ্ধ বাঘের মত ফুসতে থাকে তাহেরা।

তারপর পায়ের স্যান্ডেলটা হাতে নিয়ে বলে, বুবু কান্দিস না, মোর সাথে আয়, বলে দু’বোন ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার উপর। সজোরে লোকটাকে পিটাতে থাকে স্যান্ডেল দিয়ে।

ঘটনার আকস্মিকতায় স্থবির হয়ে যায় তার স্ত্রী। তিনি নির্বাক চোখে তাকিয়ে দেখেন এক অপমানিতের জিঘাংসা, এক সতীত্ব হরণের রূদ্ররূপ। ক্রোধ, গ্লানিতে পুড়তে থাকে তার দ্বি-বিধ বোধ।

শেষে একদলা থুতু ছিটিয়ে তাহেরা বলে, বুবু এখন চল এইখান থাকি, চল। থুক থুক…, রাহেলাও ছিটিয়ে দেয় ঘৃণার বিষাক্ত রূপ।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে।

দু’বোন রাস্তায় বের হয়ে দৌড়াতে থাকে। দেখে আলো জ্বলছে রাস্তায়। ছুটতে থাকে দ্রুত। আরো জোড়ে। এমন সময় দূরে শোনা যায় ট্রেনের হুইসেল। এই হুইসেল তার চেতনায় আগুন জ্বালায়। তার গ্লানি, ক্ষোভ একাকার হয়ে যায় ওই শব্দ সিম্ফনির স্রোতে। এই ট্রেন তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।

ট্রেন ধরার জন্য ওরা দৌড়াতে থাকে।

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]