গরম চা আমি খেতে পারি না। জিভ বাঁচাবো না ঠোঁট বাঁচাবো ভাবতে ভাবতে একটাও বাঁচানো যায় না। অযথাই শব্দ হয় সুড়ুৎ সুড়ুৎ। শুনে মানুষজন কেমন করে তাকায়, ভীষণ লজ্জা লাগে, অস্বস্তি হয়। আগে তাই চা-ই খেতাম না, এখন খাই। তবে ঠাণ্ডা করে। ফলে চা ও শরবত দুটোই খাওয়া হয়। আরসময় কম লাগে, চুমুকেই গ্লাস ফাঁকা।

পরীক্ষারখাতা দেখাও আমার কাছে চা খাওয়ার মতো। সাঁই সাঁই করে দাগাতে থাকি। মাঝে মাঝে দু’একটা শব্দ পড়ি। ভুল পেলে কাটি, না পেলে ভালো, হাতের লেখা এটাসেটা দেখে দিয়ে দিই মোটামুটি গড় একটা নম্বর। একটা খাতা দেখতে এক মিনিটও লাগে না।

এই খাতাটাও তেমন করেই দেখছিলাম। ঝোঁকে ঝোঁকে টিক মেরে গিয়েছি, শুরুর দিকে খেয়াল করিনি। নম্বর দিতে গিয়ে দেখি সারা খাতায় একটা প্রশ্নেরই উত্তর। ব্যাকরণের মতো বিষয়, দুটো সন্ধি ঠিকমতো বিচ্ছেদ করতে পারলেও দুটো নম্বর, সমাস কারক এটা-সেটায়ও গণিতের মাপ। সেসবের কোনোটাই লিখতে পারেনি? অথচ কী সুন্দর হাতের লেখা!কী চমৎকার গোছালো টিপটপ খাতা! দেখে মনে হচ্ছে ছেলেটা ভালো ছাত্র। এই ছেলে এমন করবে কেন? দেখি তো গাধাটা কী এত লিখেছে তিন ঘণ্টা ধরে।

[এই পরীক্ষায় আমি ফেল করতে চাই। পাশ করার ইচ্ছা যেহেতু নাই, খাতায় কিছু নাও লিখতে পারতাম। কিন্তু কলেজের সবাই আব্বুর পরিচিত। ব্যাচের সবচে’ ভালো ছাত্রকে অন্য ঘর থেকে নিয়ে এসে আমার সামনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলে দেওয়া হয়েছে, দরকার হলে ও যেন আমাকে বলে দেয়, খাতা দেখায়। আব্বুর খুব কাছের এক শিক্ষক আমাদের গার্ড দিচ্ছেন, ঘুরে ঘুরে পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন আর বলছেন, ‘কিছু না পারলে বোলো। ভয় পেয়ো না আমি আছি।’ যদি তিনি দেখেন আমি কিছুই লিখিনি, এবং যদি বলে দেন বাসায়, ব্যাপারটা খারাপ হবে। অবশ্য সব প্রশ্নের ভুলভাল উত্তর দিতে পারি। তবে শুনেছি সৃজনশীল পদ্ধতি আসার পর আপনাদের নির্দেশ দেওয়া থাকে যা কিছুই লেখা হোক না কেন, কিছু নম্বর দিতেই হবে। তাছাড়া কিছু শিক্ষক নাকি খাতা পড়েনই না, চোখ বুলিয়ে প্রশ্ন গুনে নম্বর দেন। আপনিও যদি সেভাবে আমায় পাশ করিয়ে ফেলেন, তাই একটা প্রশ্নের উত্তর লিখছি। যদি পড়েন, ভালো। ব্যাপারটা আপনার জানা থাকল। না পড়লেও ক্ষতি নেই, বিশ নম্বরের উত্তর পেয়ে পাশমার্ক তো আর দিতে পারবেন না!

প্লিজ স্যার (আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আপনি একজন স্যার। মনে হওয়াটা ভুলও হতে পারে। সেক্ষেত্রে ম্যাডাম), আপনার পায়ে পড়ি, ‘শতভাগ পাশ’ এর শর্ত পূরণে বাধ্য হয়েও যেন আমাকে পাশ করাবেন না। যদি করান, পরবর্তী ঘটনার দায় তাহলে আপনার।]

বলে কী! এ তো ভীষণ ধাক্কা খাওয়া কেস!

ধাক্কাটা খেলামও বেশ।

খেয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম চুপচাপ। ভীষণ অবাক লাগছে। আমাদের সময়ে কেউ কেউ ‘পাশ না করলে বিয়ে হবে না’ টাইপ কথা লিখে আসত খাতায়। অমন একটা দেখেছিলাম আমিও। ‘..বিয়ে করতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু লোকটা বুড়ো। মা বলেছে এবার পাশ করলে ভালো ছেলে দেখবে। তাই সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি ভালো লিখতে। অনুগ্রহ করে আমাকে পাশটা করিয়ে দেবেন, স্যার।’ এরপর মেয়েটাকে দেখলেই আমার ঝড় উঠতো হাসির, থামাতেই পারতাম না! তবে এই ব্যাপারটা আলাদা মনে হচ্ছে। হুমকিস্বরে এমন অনুরোধও যে কেউ করতে পারে, ভাবিনি কোনোদিন।

খাতা না দেখার ব্যাপারে যে চড় ও দিয়েছে, সেটাও ঠাস করে লেগেছে আমার চোয়ালে। খুব অস্বস্তি হচ্ছে। তবু এগুচ্ছি।

৫ নম্বর প্রশ্নের উত্তর লিখেছে সে। প্রবন্ধ রচনা। বিষয় ‘আমার পরিবার’।

 

শাখার চেয়ে বেশি প্রশাখা, তারচে’ বেশি পাতা আর ফাঁকে ফাঁকে কাঁটা-ফুল-কুঁড়ি নিয়ে গাছ। তাতে বৃষ্টি যখন পড়ে, পড়ে উপরের দিকে। তারপর চলে আসে নিচে। আড়ালে থাকা পাতা আড়ালে থাকা ডালও ভিজে যায়। ফলে গাছের প্রতিটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আগে পরে হলেও ভাগ পায় বৃষ্টির। অথচ রোদের সময় উল্টো। চারপাশজুড়ে থাকা পাতা আর ডাল ভিজে যায় আলোয়। আড়ালে থাকা ডালপাতা তখনো থাকে ছায়ায়, রোদহীনতার শোকে।

মানুষের পরিবারও অমন গাছ একেকটা। দুঃখের সময় সবাই কমবেশি দুঃখী। সুখের সময় যে যার ভাগটুকু বুঝে নিয়েই শেষ। কে বাদ পড়ল কে কম পেল খোঁজ রাখে না। যেসব পরিবার রাখে, সেসব পরিবার ভালো পরিবার। তবে সব পরিবার তেমন না। আমারটা তো না-ই।

আরেব্বাহ! কী ভীষণ আত্মবিশ্বাস ছেলেটার! এমন ভূমিকা দিয়ে রচনা লেখা কি চাট্টিখানি কথা! ওর বয়সে আমি তো বইয়ের বাইরে একটা শব্দও লিখতাম না।

বাবা শিক্ষক হলে যা হয়। আমাদের পড়তে বসিয়ে তিনি দেখতেন খাতা। বাংলা ইংরেজি অংক যা-ই হোক, বই মিলিয়ে ঠিকঠাক উত্তর পেলেই নম্বর। একটু এদিক একটু ওদিক হলেই শেষ। কালো কালো লেখার উপর নকশা করত লালরক্তের রেখা বৃত্ত ক্রস। ফলে টিকচিহ্নের লোভ আর লাল ক্রসের ভয়েই নোট বই গিলে উগরে দিতাম। তবে এই বমির খেলায় আমি ছিলাম পাসের ঘোড়া, সেরা ছিল বুবু। তখন আমরা বেশ খানিকটা বড়, আর আব্বু আরো একটু বুড়ো। শুক্রবারে বই দেখার অনুমতির বিনিময়ে আব্বুর স্কুলের খাতা দেখা শুরু করেছি। তার কলমের অনুসরণে আমরাও বমি করা ছাত্রছাত্রীর কপাল ভরিয়ে দিতাম নম্বরে।

ফাইনালের পর এই খাতা দেখাই ছিল মূল বিনোদন আমাদের। কী ভীষণ আনন্দ নিয়ে যে কাজটা করতাম! বুবু তখন সেভেনে, না যেন এইটে, আমার এক ক্লাস উপরে। ওর বন্ধু জাফর ভাইকে পছন্দ করে ফেললাম। ডানপিটে ছেলে। গান-বাজনায় সেরা। দৌড়ে সবার আগে। পড়াশোনায় একটু পিছিয়ে যদিও। তবে যা সুন্দর করে কথা বলে, দুলাভাই হিসেবে আমি তাকেই চাই। বুবুর আবার ওকে পছন্দ না। তবে আমার যেহেতু পছন্দ, ভাইয়ার খাতায় ভুলভাল থাকলেও এড়িয়ে যেতাম। আবার যারা ঝামেলা করত আমাদের সাথে, ইচ্ছে করেই তাদের ধসিয়ে দিতাম। খেলতে গিয়ে আমাদের সাথে ঝগড়া করা ছাত্রীরাও ধরা খেত! পাস করা নিয়েই তখন টানাটানি তাদের।

যা হোক, কোথায় যেন ছিলাম? হ্যাঁ, পেয়েছি।

পরিবারটা বেশ বড়। তবে বড় গাছটাকে কেটে আমরা ছোট করে নিয়েছি। তিনজন মাত্র মানুষ নিয়ে আমরা ওই পরিবারের ভগ্নাংশ। তিনজনই আমরা ব্যস্ত। আব্বু ব্যস্ত তার কাজ নিয়ে। মা ব্যস্ত তার হতাশা নিয়ে। আব্বু তাকে চাকরি করতে দেয়নি, এখন আবার সময় দেয় না। নায়িকা বলুন, উপস্থাপক বলুন বা উদ্যোক্তা, সফল কোনো নারীকে দেখলেই আম্মুর ছোট লাগে নিজেকে। শীতসন্ধ্যার কুয়াশামাখা আঁধারের মতো হাহাকার আর কষ্টে মাখামাখি হয়ে থাকে মুখটা তার। মায়া হয় খুব। আব্বুর ব্যাপারে তার অকারণ অভিযোগের জন্য বিরক্তও লাগে। বিরক্ত লাগে আম্মুর ডিপ্রেশন দেখেও আব্বুর নির্বিকার থাকা দেখে।

এসব নিয়ে ঝগড়াও বাধে। হঠাৎ হঠাৎ আগুন লাগে ঘরে। তখন একজন যায় গলায় দড়ি দিতে, একজন যায় সন্ন্যাসে! একজন আরেকজনকে চেনে না, কথা বলে না। অযথাই আমাকে এর কথা বয়ে নিয়ে ওকে শোনাতে হয়, আর ওর কথা একে। ডাকপিয়নের এই চিঠি বিলি করার বাইরে আমার আর কোনো গুরুত্ব নেই।

আহা রে! কী অভিমান বাচ্চাটার। কিন্তু সত্যিই কি এত অনান্তরিক ওর বাবা মা? আমার মনে হয়, না। বাচ্চারা বোঝে না, কাজের আসলেই শেষ থাকে না বাবা মায়ের। তবে হ্যাঁ, এত কাজের মধ্যেও সময় বের করা উচিত। সবকিছুর আগে সন্তানেরই তো গুরুত্ব। ভাবছি বটে, কিন্তু আমিও তো পারি না এমন করতে। ওর পড়া আর আমার কাজ মিলে দুইস্তরের আড়াল জমিয়ে রাখে দুজনের মাঝে। এই যেমন বেড়াতে এসেও ওকে সময় দিচ্ছি না। বিকেলে পৌঁছে একটু গল্পগুজব করলাম। একটু বেড়ালাম। তারপর কোথায় একটু গল্পগুজব করব, আনন্দ ফূর্তি করব, তা না লেগে পড়েছি কাজে। রাতে এক বান্ডিল খাতা দেখেছি। সকালে উঠেবসে গেছি আরেকটা নিয়ে।

‘ক’টা দেখলি?’

কফির মগটা নিতে এসে জিজ্ঞেস করল বুবু। কিছু না বলে খাতাটা উঁচিয়ে ধরলাম। ভূমিকাটুকু পড়ে বুবুও আশ্চর্য। ‘আরে এ তো ছাত্র না, দার্শনিক! আলাদা করে রাখ তো, পড়ব পরে।’

ঊললাম, ঠিক আছে।

কোনোকিছুই ঠিক নেই।

সারাক্ষণ আমাকে নিয়ে টানাটানি করে ওরা।

আব্বু আমাকে কিছু কিনে দিলে আম্মুও তা কিনে দেবে। আম্মু কিছু করলে তার পাল্টা কিছু না করা পর্যন্ত ঘুম হবে না আব্বুরও। আবার একজনের জন্য আমি কিছু করলে, মনে করুন ছবি আঁকলাম, অন্যজনের তখন গাল ফোলা। তখন তার ছবিও আঁকতে হবে। সবকিছুতেই প্রতিযোগিতা। ভাব দেখে মনে হয় আমি একটা দড়ি। দুদিক থেকে দুজন টানছে ইচ্ছেমতো! মাঝে মাঝে মনে হয় ছিঁড়ে যাই। কিন্তু আমি তো শক্ত খুব, থেকে যাই বহাল। ওরাও দড়িখেলার মতো জিততে থাকে একেকজন একেকবার। টানাটানির তবু শেষ হয় না। আমার জন্যই তো পাগলামি এত- মাঝে মাঝে তাই ভালোও লাগে। কিন্তু যখন বুঝি এসব আসলে ওদের ইগোর লড়াই, তখন আর লাগে না। অকারণ ওরা লেগেই থাকে একে অপরের পেছনে। ব্যাপারটা শুধু ঘরে না, ছড়িয়ে গেছে বাইরেও। দিদা আসলে তাই মুখ ভার হয়ে যায় আম্মুর। আবার নানু আসলে আব্বুর। কী যে অসহ্য লাগে আমার ওই দিনগুলো! যখনই ছুটি পাই, ভাবি বেড়াতে যাব। নানুবাড়ির প্ল্যান হলে আব্বুর ব্যস্ততা বাড়ে, দিদাবাড়ির কথা উঠলে আম্মুর শরীর খারাপ। আবার একা একাও যেতে দেবে না।

 

‘এই নে, এক বান্ডিলের বেতন।’ টেবিলে একবাটি মুড়িমাখা রেখে বলল বুবু।

‘এত দিয়েছো কেন? দুপুরে কি না খাইয়ে রাখার প্ল্যান?’

‘ঢং করিস নে, খা। মুড়ি যে তোর কত পছন্দ আমি জানিনে!কিন্তু ওই একটা খাতা নিয়েই কি পড়ে থাকবি নাকি? মনে হচ্ছে প্রেমপত্র, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছিস!’

‘কী পত্র যে পড়ছি, বুবু! যাও, আগে শেষ করি।’

‘আচ্ছা কর। আমি উপরে গেলাম। কাপড়গুলো নেড়ে দিয়ে আসি। চুলোয় মাংশ, খেয়াল রাখিস।’

কোথায় চুলো কোথায় মাংশ, আমি ডুবে গেলাম মুড়ির বাটিতে। মনে হচ্ছে নানুভাই মেখে দিয়ে গেল!

কী দিনই না ছিল সেসব!

পরীক্ষা শেষ হলেই ছুট দিতাম নানাবাড়ি। উড়ে বেড়াতাম মুক্তপাখির স্বাধীনতায়।

আমাদের সাথে খেলতে খেলতে হাঁপিয়ে উঠত সূর্য। তারপর ঘুমিয়ে পড়ত ক্লান্তির চোটে। উঠোনে তখন সন্ধ্যা বিছিয়ে বসতাম আমরা। শুরু হতো চোর ডাকাত, না হয় লুডু, নইলে গানের লড়াই। গামলা ভরে তখন মুড়িমাখা বা এটা সেটা ফলের ঝালাই দিয়ে যেত নানু। মুঠোয় মুঠোয় যেন অমৃত উঠে আসত মুখে! এসব আমার দাদিও করত। তবে নানির মুড়ি বা ঝালাইয়ের কাছে সে কিছুই না। দাদির হাতের তালের বড়া আর চালকুমড়োর মোরব্বার যেমন তুলনা হতো না অন্য কিছুতেই। আর ছিল তার গল্পের গাল। আমরা তো দাদির কাছেই ঘুমোতাম, দুইজন দুইপাশে। সারারাত তাকে জ্বালিয়ে মারতাম গল্প বলার জন্য। কত শত গল্প যে জানত দাদি। জানত নাকি বানাত কে জানে, ঠোঁট গলে তাঁরবেরুতেই থাকত নতুন নতুন হাতি ঘোড়া পঙ্ক্ষীরাজ! তাতে ভেসেই তো কাটিয়েছি রাঙা শৈশব!

আমার কোনো শৈশব ছিল না। কৈশোরও নেই। ছোট থেকেই এরকম বাসাবন্দি আমি। বই পড়ে আর কতক্ষণ ভালো লাগে? দম বন্ধ হয়ে আসে। কিছুদিন আগে আব্বুর ঘুষ নেওয়ার একটা ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে বাসাটাও আর সহ্য হচ্ছে না।

ছোটবেলার একটা কথা মনে পড়ছে।

একদিন খুব মন খারাপ করে বাসায় এলো আব্বু। এসেই বলল আমাদের দুটো গাড়িচুরি হয়ে গেছে। তারপর গিয়ে শুয়ে পড়ল। অন্যসময় কিছু চুরি গেলে বা হারিয়ে গেলে অস্থির হয়ে ওঠে। ফোন দিয়ে দিয়ে পুলিশ র‌্যাবেরঘুম হারাম করে দেয়। অথচ সেদিন কোনো উচ্চবাচ্যই নেই! অবাক লাগল দেখে। পরের সন্ধ্যায় খবরে দেখাল সেই গাড়ি। পড়ে ছিলরাস্তার পাশে। কিন্তু কে মালিক কে ড্রাইভার কী বৃত্তান্ত কোনো হদিস নেই। আব্বুকে ডেকে দেখালাম। সে বলে এটা আমাদের গাড়ি না। আমি নম্বরপ্লেট দেখেছি, বললাম। তবু সে বলছে আমাদের গাড়ি না। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না গাড়িটা আমাদের না হয় কী করে। এখন বুঝি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চলছিল বলে ইচ্ছে করেই হয়তো ফেলে এসেছিল আব্বু। অমন আরো আরো আকাম কুকাম নাকি করে বেড়ায় সে। ঘরে বাইরে এসব নিয়ে কত কথা যে শুনতে হয় আমাকে! বন্ধু বান্ধবীরা পর্যন্ত ছেড়ে কথা বলে না। লজ্জায় অপমানে মাথা কাটা যায়। ঘুষের টাকায় খাই পরি মাখি- ভাবতেই গা জ্বলে। মনে হয় আগুন ডেকে জ্বালিয়ে দিই সব। নইলে পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দিই আব্বুকে। নিদেনপক্ষে পালিয়ে যাই। কিন্তু তার হো হো হাসি আর আম্মুর কোল ছেড়ে থাকতে পারব না বলে যাই না।

বাহ! ছেলে তো প্রতিবাদী! বুবুও প্রায় এমনই ছিল।

মনে আছে, তখন আমি টেনে। না, নাইনে। আব্বুর জ্বর, উঠতে পারছেন না। বুবুকে বললেন বিড়ি আনতে। ও বলল, ‘বিড়ি টানা স্বাস্থ্যর জন্যি ক্ষতিকর। অকারণ টাকা পুড়োয়ে ধোঁয়া উড়োয়েই বা কী লাভ! যান, আজকে থেকে বিড়ি খাওয়া বন্ধ।’ আব্বু তখন রেগে আগুন! হুংকার দিয়ে বললেন ‘বিড়ি খাই কি বিষখাই তাতে তোর বাপের কী? তোর বাপের টাকায় খাই নাকি, খাই নিজের টাকায়!’ ভয়ে ভয়ে বুবু চলে গেল দোকানে। পরে আমি বললাম, ‘বুবু, তুই বলতে পারলি না, আমার বাপের টাকায়ই তো খাও। যাও, আব্বু বলেছে ঘরে টাকা নেই!’ হাসতে হাসতে বুবু বলল, তোকে যেদিন বলবে, সেদিন বলিস!

সেই সুযোগ আর পাইনি কোনোদিন। পরের সপ্তায়ই নেই হয়ে গেল আব্বু!

কী যে কষ্ট তখন হতো আমার! ঘুরতে ফিরতে শুধু আব্বুর কথা মনে হতো। হাসতেও ভুলে গিয়েছিলাম। আব্বুর সাথে আমার স্মৃতি বলতে একসাথে বসে পড়া, আর খাতা দেখা। সেই খাতা দেখাও বন্ধ ছিল অনেকদিন। বুবু শিক্ষক হলে আবার সুযোগ হলো। বিয়ের পর অবশ্য ছেদ পড়েছে তাতে। ওর বাড়ি এলেই তাই সুযোগটা ছাড়ি না। মনে হয় পাশে বসেই বড়দের খাতা দেখছেন আব্বু। আর বিরক্তি প্রকাশ করছেন মাঝেমাঝেই। একটু পরেই উঠে যাবেন রাগ করে। ‘নাহ! কী শিখাই, আর এরা কী লেখে! গরু হয়ে ঢুকেছে, গাধা হয়ে বের হবে। তারপর টানবে পরের বোঝা!’ খাতা দেখতে তাই অন্যরকম আনন্দ পাই আমি। অথচ এরা এটা এড়াতে পারলে বাঁচে। ভাইয়া বলেন, ‘খাতা দেখার মতো কঠিন কাজ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই!’ এবার দেখি বুবুরও এই অবস্থা। ‘এত খাতা, আর এত নিয়ম কানুন এখন, ন্যূনতম স্বাধীনতা নেই। আমার আর ভাল্লাগে না।’ আমি আসলে তাই খুশিই হয় ওরা। একের পর এক বান্ডিল এগিয়ে দেয়, টপাটপ দেখে দিই। বিনিময়ে আমার পছন্দের খাবারগুলো রান্না করে বুবু। রান্না করতে করতে হাক ছোড়ে। ‘কিপটেমি করিসনে যেন। কেউ ফেল করলে আবার ঝামেলায় পড়ব।’

যা হোক, যা বলছিলাম,আমার ব্যাপারে কোনো কিছুতেই আব্বু-আম্মুর মতের মিল হয় না। না পোশাক আশাক না খাওয়া দাওয়া। আম্মু এটা বলে তো আব্বু তার উল্টো। আব্বুর স্বপ্ন ছিল সিএ করার, করতে পারেনি। চাটার্ড একাউন্টেন্ট বন্ধুদের গল্প সে কী পরিমাণ আক্ষেপ নিয়ে যে করে, বলে বোঝানো যাবে না। ফলে এখন চায় আমি সিএ করি। ব্যাপারটা আমি বুঝি। নিজে হতে পারেনি, সন্তানকে দিয়ে জ্বালা মেটাতে চায়। কিন্তু আম্মু কেন যে সব বাদ দিয়ে আর্টস পড়াতে চায়, ফরেন ক্যাডার বানাতে চায়– জানি না। এই নিয়ে তাদের তুমুল ঝগড়া হলো একদিন। ঝগড়াশেষে আমাকে কমার্সে ভর্তি করালো আব্বু!

সমস্যাটা ভাইয়ারও আছে। ঐক্যকে মেডিকেল কোচিংয়ে দিয়েছে জোর করে। ছেলের সবকিছু হতে হয় তার পছন্দমতো। বুবুকে জিজ্ঞেসও করে না। বলে, ‘মান্ধাতা আমলের মেয়ে মানুষ, তুমি এসবের কী বোঝো!’ এই হচ্ছে ভাইয়ার দোষ। খোঁচা মারা শুরু হলে থামতেই চায় না। কাল রাতেই দেখলাম বুবুর শিক্ষকতা নিয়েও তার চুলকানি। ‘ইন্টার পাশ মেয়েদের শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে ভুল করছে সরকার। এরা নিজেরাই বোঝে না, ছাত্র বোঝাবে কী!’ বুবুও বকলো উল্টোপাল্টা। ‘মাস্টার্স করে কী এমন উদ্ধার করেছো বলো! জুতোর তলা ক্ষয় করে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকই তো হলে! তাও আবার বস্তাখানেক টাকা ঢেলে! এখন বলো, তোমার বুদ্ধিতে এগিয়ে ছেলে আমার কতদূর যাবে?’ তবে গলার জোরে ও এঁটে ওঠে না। ভাইয়া যা বলে, আপত্তি থাকলেও মেনে নেয়। এই নিয়ে ওর দুঃখও কম না। ভাইয়া ঘুমোতে চলে গেলে গল্প করছিলাম আমরা। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমার মত না নেয় না নিক। ছেলেটাকে তো জিজ্ঞেস করতে পারত, ও কী চায়! আহা রে সোনাটার আমার ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার ইচ্ছা। লোকটার ত্যাড়ামির কারণে হলো না।’

আমাকেও জিজ্ঞেস করল না আমি কী চাই। বা কী আমি পারি সবচে’ ভালো। কতবার কাঁদতে কাঁদতে বলেছি এই পড়া আমার ভালো লাগে না। আমি পারছি না। আব্বু শোনেনি। মাঝে মাঝে মনে হয় আত্মহত্যা করব। মজাটা তখন বুঝবে ওরা। কিন্তু মরে গিয়ে মজা দেখানো গেলেও দেখা তো যাবে না। প্রথমে তাই ফল খারাপের পথ বেছে নিয়েছিলাম। ইচ্ছে করেই খারাপ পরীক্ষা দিলাম। লিখলাম মোটামুটি ফেল করার মতোই। তবে গভর্নিং বডির মেয়েকে ফেল করানোর সুযোগ মনে হয় স্যার ম্যাডামদের নেই। অবশ্য গোল্ডেনও হলো না। কী চোটপাট তখন আব্বুর। অন্যদের রেজাল্ট শোনে আর চীৎকার জোড়ে। আর তেড়ে তেড়ে আসে মারতে। তার মাথা নাকি আমি হেঁট করে দিয়েছি! আচ্ছা! আমার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে বলে তার চিন্তা না, চিন্তা তার স্ট্যাটাস নিয়ে! ভীষণ কষ্ট লাগে ভাবলে। আম্মুও তা-ই। যে ভাইয়া আমাকে পড়াতে আসে, তার নজর ভীষণ খারাপ। আমি পড়ি বই, সে পড়ে আমার বুক। আর কিছুক্ষণ পরপর বাথরুমে যায়, অন্তত দুবার তো যায়ই। আমার ধারণা, সে মাস্টারবেট করতে যায়। করে করুক, আমার তাতে কী। আমাকে ভেবে কেউ উত্তেজিত হচ্ছে, ভাবতেই বরং ভালো লাগে! কিন্তু বেশি ভালো যে ভালো না, সেটা বুঝলাম হাফইয়ারলি পরীক্ষার রেজাল্টের পর। একটু বেশিই খারাপ করেছি এবার। ভাইয়া আমাকে বকছে। ভীষণ রেগে গেছে বোঝা যাচ্ছে। হঠাৎ উঠে এসে জড়িয়ে ধরল। জোর করে এক চুমু খেল ভীষণ! তারপর বেরিয়ে গেল হনহন। কী থেকে কী! বুঝে উঠতে পারলাম না কিছুই। কাঁদতে কাঁদতে আম্মুকে বলতে গেলাম, মুখই তুলল না। সে তখন হোয়াটস অ্যাপে, হয়তো ভাসছে নতুন কোনো তরুণরসে। আব্বুও দেখি তরুণী কলিগদের প্রতি অন্ধ। স্বাক্ষী আন্টির সাথে তার আচরণ তো নির্লজ্জরকম গদগদ। অথচ সামনাসামনি কী ভাণ এদের ভালোবাসার! গা আমার জ্বলে রি রি। আমাকে আবার বিএফের সাথে মিশতে দেয় না! কী যে অদ্ভূত নিয়ম এদের!

আচ্ছা, খাতাটা সুপ্তির না তো!

ভাবতেই মাথা ঘুরে উঠল। কান গরম হয়ে গেছে। বুক ঢিপঢিপ করছে। দৌড়ে গেলাম মা’র ঘরে। যত বেগেই ঢেউ আসুক, তীরে এসে সে যেমন গতি হারায়, এলিয়ে পড়ে, অমন করে মিইয়েও গেলাম কাছে গিয়ে। তবে সামলে নিলাম। বুকে যে আমার ভূমিকম্প, সেটা ওকে বুঝতে দেবো না।

একমনে মোবাইল টিপছে মেয়েটা। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোনো পরীক্ষা কি তোমার খুব বাজে হইছে, মা?’

উত্তর দিল না। গায়ে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করতে হলো।

‘হোয়াট হ্যাজ এক্সাক্টলি হ্যাপেন্ড টু ইউ, মম, বলো তো? এই প্রশ্নের উত্তর আর কতবার দিবো! থাউজ্যান্ডস টাইমস বলা হই গেছে, এক্স্যাম সব ভালো দিছি। গোল্ডেন না হইলেও এ প্লাস থাকবে, মাস্ট।’

যথারীতি খেকিয়ে উঠল মেয়ে আমার। তবু আমার মিনমিনে গলা ।

‘টেনশন হচ্ছে বলেই না জিজ্ঞেস করছি। যা ভুলোমন তোমার, কী না কী লিখছো।’

বলে এটা সেটা নাড়তে লাগলাম। চুলে বিলি দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা মা, বাংলা দ্বিতীয় পত্রে তুমি কী রচনা লিখছিলা?’

আবার ও ডুবে গেছে গেমসে। এই গেমসই হয়েছে কাল। সারাক্ষণ চোখ গুঁজে থাকে। ওর দেখাদেখি আমিও আসক্ত হয়ে পড়েছি। কাজ থাকলে ভালো, না থাকলে মোবাইল সারাক্ষণ। নিজের কাছেই অসহ্য লাগে মাঝেমাঝে।

‘কী হলো? উত্তর দিচ্ছ না কেন?’

‘হুঁ! কী উত্তর দিব?’

‘বাংলা দ্বিতীয় পত্রে কী রচনা লিখছিলা?’

‘মাই ফ্যামিলি।’

আরো জোরে কেঁপে উঠলাম শুনে। বুকের রিখটার স্কেল মাত্রা ছাড়াল। মনে হলো মাটি যেমন ফাঁক হয়ে যায়, অমন করে শুন্যতা তৈরি হয়েছে। আমি ঢুকে যাচ্ছি অনন্ত অন্ধকারে। হাত পা নাড়ছি, কিছুই পাচ্ছি না ধরার। নিঃশ্বাস দ্রুত পড়ছে।

কিছুক্ষণ কথা বেরুলো না মুখ দিয়ে। সময় নিয়ে বললাম, ‘এটা কেন লিখলা? অন্য কোনোটা লিখতে পারতা না?’

‘শিওর আই কুড। বাট লিখি নাই। তুমিই তো বলছিলা বানায়ে লেখার চেয়ে এক্সপেরিয়েন্স থেকে লেখা ভালো। তাতে প্রাণ আসে লেখায়, পড়তে কমফোর্ট ফিল করে মানুষ।’ বলেই ও আমার দিকে তাকালো এবার। ও তো না, তাকালো যেন ফেলুদা।

‘আচ্ছা, তুমি না খাতা দেখতেছিলা?’

‘হুম!’

‘কী খাতা, বাংলা? উল্টোপাল্টা কিছু পাইছো নাকি?’

‘না, তা কেন হবে। এমনিই জিজ্ঞেস করতেছিলাম। আচ্ছা, ঠিক আছে থাকো। যাই দেখি বুবু কী করছে।’

বললাম বটে, কিন্তু গেলাম না। গা হাতপা অবশ হয়ে গেছে। মেয়েটার দিকে তাকাতেও পারছি না, লজ্জা লাগছে। দিনে দিনে কত দূরে চলে গেছি আমরা! ভাবতে ভাবতে আনমনেই আবার দেখছি খাতাটা। কিন্তু পড়তে আর ভালো লাগছে না। উল্টে উল্টে তাই শেষ প্যারায় চলে গেলাম। ব্রাকেটের মধ্যে তখন মেয়েটার কৈফিয়ত।

[এক ফোঁটা খেয়ালও কেউ করে না আমার দিকে। কী করছি কোথায় যাচ্ছি খোঁজ নেই। পড়ছি কি না জিজ্ঞেসও করে না। শুধু ফল খেতে চায় মিষ্টি। এসেসসিতে বেশি মিষ্টি হয়নি বলে এবার প্রশ্ন কেনা শুরু করেছে! পরীক্ষার আগের রাতেই প্রশ্ন নিয়ে চলে আসে! কালও এনেছে। আমি বলি এটা অন্যায়। ‘মরে গেলেও এ প্রশ্ন আমি দেখব না।’ অন্য ব্যাপারে পায়ে পা বাধিয়ে আব্বুর সাথে ঝগড়া করে আম্মু। অথচ এ ব্যাপারে সে-ই আব্বুর উকিল। উকিলের মতোই ঠেসে ধরে আমাকে। ‘রাগ করিস না মা। রাতটুকুই তো সময়, প্রশ্নটা দ্যাখ ভালো করে। ভালো রেজাল্ট না করলে ভালো জায়গায় চান্স পাবি না।’

‘পেলে পাব, না পেলে নাই। তবু আমি ওই প্রশ্নে হাত দেব না। মরে গেলেও না।’ বলার সাথে সাথেই আব্বু এসে মারল আমাকে কাল, জানেন? জোর করে ধরে পড়ালো। আমাকেও নিজেদের মতো বানাতে চায়, বুঝেছি। কিন্তু আমি তো তা হবো না। তাই যতবার এমন করবে, ততবারই আমি ফেল করব। আপনি যদি আমাকে পাশ করিয়ে দেন, তাহলেও সমস্যা নেই। পরেরগুলোতেও আমি এভাবেই লিখব। কোনোটা না কোনোটায় নিশ্চয়ই ফেল করব। না করলে..

‘আচ্ছা মম, সত্যি করে বলো তো, হোয়াট হ্যাপেনড! কোনো উল্টাপাল্টা লেখা দেখে কি ভাবছো ওইটা আমার!দ্যাটস নট ফেয়ার, মম!’

কিছু বললাম না। ভেতরে একটু আশার আলো। খাতাটা হয়তোসত্যিই সুপ্তির না। না হোক প্রভু, না হোক! এবার থেকে ভালো হয়ে যাব! যা হওয়ার হয়েছে। বদলে নেব নিজেকে। ভাবতে ভাবতে পা বাড়ালাম।

‘ওহ ওয়েট ওয়েট ওয়েট! আমাদের খাতা কি আঙ্কেলের কাছে এসছে? তাইলে মে বি খাতাটা সুমির। দেখি দেখি খাতাটা, লেট মি সি!’

তা কি আর দেবো!

সুমি খুব ভালো বন্ধু সুপ্তির। কিন্তু সুমির বাবা মাকে দেখে তো মনে হয় না এমন কিছু। সুমিকেও তো উজ্জ্বল উচ্ছলই দেখি। বললাম, ‘কেন? সুমি কী লিখেছে?’

‘আর বইলো না। শুনে তো মাথা পুরাই হ্যাঙ!’ ‘প্রিয় শিক্ষক’ রচনায় সে সেলিম স্যারের যত নোংরামি নষ্টামি লিখে দিছে। শেষে বোলছে, ‘এমন যারা করেন না, তারাই আমার প্রিয় শিক্ষক!’

বলেই মেয়েটা হাসছে খিলখিল। আমিও যোগ দিলাম। কিন্তু হাসিটা আমার ফুটলো না সেভাবে।

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]