সময় গড়ালে সম্পর্ক সিদ্ধ হয়। শুরুর দিন থেকে এখন অবধি যতোবার তন্ময় আর নাফিসার দেখা হয়েছে এবং হয়। প্রায় সময় তন্ময় নাফিসার চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। এমন তাকিয়ে থাকলে নাফিসা লজ্জা পায়। কখনো বা অস্বস্তি বোধ করে। তাই সে তন্ময়কে নিষেধ করেছে মুগ্ধ প্রেমিকের মতো এভাবে না তাকাতে, কিন্তু তন্ময় নাছোড়বান্দা। তন্ময়কে নিষেধাজ্ঞায় আটকাতে না পেরে নাফিসা হাতঘড়িতে সময় মেপে শর্ত জুড়ল! এক মিনিট তন্ময় নাফিসার চোখে চোখ স্থির রাখতে পারবে। এক মিনিটের বেশি হলে নাফিসা উঠে চলে যাবে! নিঃসন্দেহে এটি তন্ময়ের জন্য কঠিন শর্ত। কিন্তু চাইলেই তো আর শর্ত দিয়ে মনের মুগ্ধতা ও চাওয়াকে আটকানো যায় না। তন্ময় নাফিসার চোখে চোখ রেখে কিছু যেন খোঁজে, কী যেন ভাবে, কোনো কথা যেন বলে। কিন্তু নাফিসা ধরতে পারে না। কিন্তু নাফিসা বুঝতে পারে না।

তারপর তন্ময় ফের স্বাভাবিক স্বভাবে ফিরে আসে। এমন মনে হয় যেন পরিচিত স্টেশনে মিনিটখানিকের বিরতি দিয়ে আবার ছেড়েছে গন্তব্যগামী ট্রেন।

আচ্ছা, তোমার চোখ দুটো এতো সুন্দর কেন?

তন্ময়ের কথার জবাবে নাফিসা বলল– আমার চোখ! তুমি জানো না? চোখ দুটি আমার নয় । যার চোখ তিনি নিশ্চয় সুদর্শন ছিলেন কিংবা রূপবতী! তাই তাঁর চোখ দুটি সুন্দর হয়েছে।

– মানুষ সুন্দর হলে বুঝি চোখ সুন্দর হয়?

নাফিসা পিংক লিপস্টিক রাঙা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলল– উম্ম… হয় ।

– তুমি কখনো চোখদানকারীকে নিয়ে ভাবো ?

– কী যে বলো না তুমি । চোখদানকারীর প্রতি আমার ঋণ চিরকালের। তুমি হয়তো জানো না। আমি চোখদানকারীর পরিবারকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। সন্ধানী ঢাকা মেডিকেল ইউনিটে গেলে
হয়তো পরিবারের এড্রেস পাওয়া যাবে, কিন্তু যাবো যাবো বলে যাওয়া হচ্ছে না।

– কেন ? খোঁজ করছো কেন ?
– চোখদানকারী তো মারা গেছেন। আমার কৃতজ্ঞতা চোখদানকারীর স্থলে তার পরিবারকে সরাসরি জানাতে খোঁজ করছিলাম।

কথাটি শোনামাত্রই তন্ময় শিহরিত হয়ে বলল– বাহ, তোমার চমৎকার কৃতজ্ঞতাবোধ।

– যাকগে আমি বাসায় গেলাম। তুমি কাল দুপুরকে নিয়ে এসো একসাথে লাঞ্চ করবো। আমার আগামীকাল একটা মাত্র ক্লাস। বারোটার আগে বের হবো।
তন্ময়– চলো তোমাকে পৌঁছে দিই।

এই বলে পরস্পর একটা রিক্সাতে উঠলো। রিক্সাওয়ালা বলল– কৈ যাইবেন?
তন্ময়– নাবিস্কো মোড় ।

তন্ময় আর নাফিসার প্রেমের বয়স মাত্র ছয়মাস। এই ছয়মাসে তাদের প্রেমের গভীরতা পরস্পরকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে আগ্রহী করে তুলেছে। তন্ময় কানাডা প্রবাসী। পাঁচ বছর আগে বাচ্চা প্রসবের সময় তার বউ মারা যায়। মা মরা কন্যা সন্তানটির নাম দুপুর। দুপুর প্রায় বলে– আব্বু, মাম কোথায়? আমার মাম নেই? তন্ময় কোনোরকম মেয়েকে বুঝ দেয়– মাম্মি, তোমার মাম অনেক দূরে বেড়াতে গেছে। বেড়ানো শেষ হলে আসবে। বাবা একটা বাচ্চা মেয়েকে সহজে বুঝ দিয়ে রাখে, কিন্তু বাচ্চা মেয়েটি ঠিকই বুঝে যায়– আব্বু তার সাথে সহজ করে মিথ্যা বলছে।

তখন তন্ময় আর নাফিসার সম্পর্কটা টিকে যাচ্ছে। মানে যখন তারা আগ্রহভরে একে অপরকে জানছে। ঠিক সেই সময় রেস্টুরেন্টে কফির পেয়ালা সামনে তন্ময় বলেছিল– বিয়ের পরপরই তানিয়াকে আমার সাথে কানাডায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে নিতে পারিনি।

ভিসা জটিলতা কাটিয়ে যখন আমি নিতে আসলাম তখন ওর ডেলিভারির সপ্তাহখানেক বাকী। তানিয়া বলল, ডেলিভারির পরেই যায়। আমিও জোর করলাম না। পরেতো ও আর যেতে পারল না। দশদিনের কন্যা শিশুটি নিয়ে আমি কানাডায় চলে যাই। ওখানে আমার বোনের হাতে তুলে দিই। দুপুরের এখন পাঁচ বছর বয়স। দেশে তানিয়ার একটা স্মৃতি আছে। আমি সেই স্মৃতিটির সামনে দুপুরকে দাঁড় করিয়ে তানিয়ার মৃত্যুর কথাটি বলতে চাই। আমি চাই মাতৃহীন মেয়েটি মনে প্রাণে ওর মায়ের আদর্শ ধারণ করুক। জন্মের পরপরই ওর মা মারা গেছে, নির্মম সত্যটি দুপুরের জন্য শোকের নয় বরং গর্বের হয়ে উঠুক।

ভ্রু বাঁকা করে নাফিসা বলল– কীসের স্মৃতি, কেমন গর্ব?

থতমত খেয়ে তন্ময় বলল– কিছু না, তোমাকে অন্য একদিন বলব।

ঠিক এমনি আরেকদিন। মানে যখন পরস্পর একে অপরকে জানছে। সেদিন নাফিসা তন্ময়কে পার্কের বেঞ্চিতে পাশাপাশি বসে বলল– আমার হাজব্যান্ড ছিল শেয়ারহোল্ডার। শেয়ার বাজারে ধস নামলে ওর ব্যাপক লোকসান হয়। পুঁজি হারিয়ে একেবারে ভেঙ্গে পড়ে। আমি তখন সবেমাত্র চাকরিটা পেয়েছি। ওকে অভয় দিয়েছি কিন্তু আমার কথা শুনেনি বরং বাসায় আমার সাথে অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। প্রতিরাতে ড্রিংকস করতো। নিষেধ করলে আমাকে মারধর করতো। একদিন আমি ডাক দিলে পশুর মতো রেগে কলম দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমার চোখে আঘাত করে। এতে আমার দুই চোখের কর্ণিয়া নষ্ট হয়ে যায়। চোখের আলো হারিয়ে আমি অন্ধত্ব বরণ করি। আমি সুস্থ হয়ে উঠলে ওকে ডিভোর্স দিই কিন্তু ও আমাকে ডিভোর্স দেয়নি। একদিন খবর এলো কুমিল্লা থেকে ঢাকায় ফেরার পথে রোড এক্সিডেন্টে ওর স্পস্ট ডেট হয়েছে।

কথাগুলো বলতে বলতে নাফিসার গলা ধরে আসছিল। গলিত মোমের মতো চোখ থেকে ঝরে পড়ছিল অবাধ্য বারি। আর সেই দিনই প্রথম অতি আদরে নাফিসার মাথা তন্ময় তার বুকে টেনে নিয়েছিল।

আগামী সোমবার দুপুরের জন্মদিন। আবার ওই দিনই দুপুরের মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে তন্ময় অন্ধকার রুমে বসে ভাবছে দুপুরের জন্মদিনে ওর মায়ের মৃত্যুর কথা ওকে বলবে না কি বলবে না? এতোটুকুনি একটা বাচ্চা মেয়ে। সে কি পারবে জন্ম থেকে মাতৃহীন এই সত্যটি মেনে নিতে?

যদিও বা দুপুরের যে মা নেই।এই সত্যটি দুপুর নানাভাবে অনুভব করেছে। শত আদর-সোহাগ দুপুরের জীবনকে উষ্ণ করুক। শত রং-য়ে রাঙানো হোক দুপুরের বেলা। কোনো না কোনোভাবে সে অনুভব করেছে মায়ের উষ্ণতা ও মায়ের রঙ-টাই কেবল অনুপম।ছোটদের বোধশক্তি বড়দের বোধশক্তির সমান হয় না। তবে সময়মতো বড়দের বোধশক্তিকে ছোটরা দারুণভাবে ছাড়িয়ে যায়। এক্ষেত্রে দুপুরের বোধশক্তি নিয়ে তার বাবা গর্ব করতেই পারে। দুপুরকে না হোক অন্তত নাফিসাকে সেই সত্য কথাটি বলবে। যা বলবে বলে বলেনি কিন্তু তন্ময় কি পারবে? প্রিয়তমার মুখোমুখি হয়ে অকপটে সত্য বলতে? নাফিসার প্রিয় চোখজোড়ার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে বলতে চিরচেনা চোখের কথা!

মানুষ অন্ধকারকে ভয় করে বলেই ভীতু হয়ে যায়। অথচ অন্ধকার হল সাহসী হওয়ার উৎকৃষ্ট উৎস। সম্ভবত তন্ময় এই অন্ধকার থেকেই সাহসী হয়ে উঠছে।

দুপুর ড্রেসিংটেবিলের সামনে টুলে বসে আছে। বাবা তন্ময় মেয়ের চুল আঁছড়িয়ে দিল, চোখের ভ্রুতে কাজল টেনে দিল, পায়ে জুতা পরিয়ে দিল। দুপুর আদরণীয় কন্ঠে বলল– আব্বু, আমরা ঘুরতে যাবো? বাবা হেসে বলল– ইয়েস, মাই ডিয়ার ডটার। আমরা এখন ঘুরতে যাবো। তুমি বসো আব্বু রেডি হয়ে আসি।

এর মধ্যে দুপুরের দাদী এসে খাটে বসল। মিছেমিছি গোমড়া মুখ করে বলল– দুপুর, তুমি গ্র্যান্ডমাকে বাসায় রেখে ঘুরতে যাবে? আমি কিন্তু কান্না করবো।

দুপুর দৌড়ে এসে দাদীর কোলে উঠল। দাদীর মুখে শব্দ করে চুমু দিয়ে বলল– প্লীজ, ডোন্ট ক্রাই। আমি তোমার জন্য ক্যান্ডি নিয়ে আসবো! নাতনীর মুখে কথাটি শুনে দাদী গাল ভরে হেসে উঠল।

রেস্টুরেন্টে নাফিসা দুপুরকে চামচে করে স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছে। তন্ময় অপলক নাফিসার দিকে তাকিয়ে আছে। তন্ময় যে নাফিসার দিকে তাকিয়ে আছে তা নাফিসা ধরতে পেরেছে। তন্ময়ের তাকিয়ে থাকার দৃষ্টিকে পাশ কাটিয়ে নাফিসা গলা ঝেড়ে বলল– কী ? স্যুপ খেতে ইচ্ছে  করছে? অর্ডার দিবো? তন্ময় মৃদু হেসে বলল– স্যুপ! আমি! নাফিসা– তো কে? যেভাবে স্যুপের দিকে তাকিয়ে আছো। দেখে তো মনে হচ্ছে তোমার জিভে বুঝি জল এসে গেল। না-বোধক মাথা নেড়ে তন্ময় বলল– আরে না।

নাফিসা– তো কি?

তন্ময়– আজ স্পেশাল ক্রাশ খেলাম তোমার উপর !

বিস্ময়ের সাথে আগ্রহ নিয়ে নাফিসা বলল– ক্রাশ!  আচ্ছা, আজ আমার উপর সবাই ক্রাশ খাচ্ছে কেন? আমি তো প্রতিদিনকার মতোই সাদামাটা।

তন্ময় নবাব সিরাজউদ্দৌলার মতো ঢং করে বলল– কে আবার ক্রাশ খেল? কার এতো সাহস?

তন্ময়ের কথা শুনে নাফিসা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার অবস্থা।কোনোরকম হাসি নিয়ন্ত্রণ করে দুপুরের মুখের সামনে স্যুপের চামচ ধরে বলল– ধর মা খা।তারপর তন্ময়কে বলল– আজ ক্লাসে ছেলে মেয়েরা বলছিল, ম্যাম, আপনাকে শাড়িটা বেশ মানিয়েছে। খোলা চুলে বড় বড় চোখ দুটোয় কাজল টানা। এসবের সাথে খয়েরি রঙের টাঙাইল শাড়ি। সো এক্সক্লুসিভ। তন্ময়– একদম ঠিক বলেছে তোমার স্টুডেন্টসরা। ঠিক তখনি তন্ময় আর নাফিসার কথার মাঝে দুপুর ঢুকে পড়ে বলল– আন্টি, আই উইল গো ইউর ক্লাস।

নাফিসা হেসে বলল– তাই! ওকে মামনি। একদিন আমার সাথে তোমাকে নিয়ে যাবো ক্লাসে। দুপুর তার শিশু কণ্ঠে বলল– হোয়াট ইজ ন্যাম অফ ইউর স্কুল?এই কথা শুনে তন্ময় ও নাফিসা হা হা করে হেসে উঠল। তারপর নাফিসা বলল– আমি কোনো স্কুলে পড়ায় না মামনি। আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। ইউনিভার্সিটির বাংলা অর্থ হল বিশ্ববিদ্যালয়।ওখানে বড় বড় বাবুরা পড়ে!

দুপুর কিছু বুঝতে পেরেছে কি না কে জানে? নাফিসার কথা শেষ হলে সে তার ছোট্ট ব্যাগ থেকে একটা কাগজের টুকরো বের করে আন্টিকে দিল। নাফিসা কাগজের টুকরোতে পেন্সিলে লেখা ইংরেজি লাইনটি দুপুর ও তন্ময়কে শুনিয়ে পড়ল, টুমোরো ইউ ইনভাইটেড ইন মাই বার্থডে। নাফিসা– থ্যাংক ইউ মামনি থ্যাংক ইউ। খুব খুশি হয়েছি আমি। বলো তোমার জন্মদিনে আন্টির কাছে কী এক্সপেক্ট করো?

দুপুর ধীর কণ্ঠে বলল– আমার মামকে কাল নিয়ে আসবে? আব্বু বলেছে বেড়াতে গেছে কিন্তু এখনো তো আসে না।

কথাটি শেষ হতেই নাফিসা পরম স্নেহে দুপুরকে জড়িয়ে ধরল। আবেগ ধরে রাখতে না পেরে তন্ময় ছলছল চোখে চেয়ার থেকে উঠে বেসিনে গেল।

ওইদিন দিবাগত রাতে আচমকা দুপুরের গায়ে জ্বর এলো। জ্বরে শরীর কাঁপছে। কিছু খেতে পারেনি, বমি করে ফেলে দিয়েছে। বাবা আর দাদী মিলে যেটুকু ঔষধ খাইয়েছিল তাও ছেড়ে দিয়েছে বমি করে। জ্বরের ঔষধ খাওয়ানোর পর জ্বর আগের চেয়ে সামান্য কমেছে। জ্বরের ঘোরে দুপুর মাম মাম করে ডাকছে। এমতাবস্থায় তন্ময় কী করবে বুঝতে পারছিল না। এই মুহূর্তে মেয়েকে মিছে সান্ত্বনা দেয়ার সাহস তন্ময়ের নেই। এখন রাত বারোটা বেজে চল্লিশ। নাফিসাকে ফোন করে আসতে বললে কেমন হয়? এত রাতে একটা মেয়ে মানুষ একা আসা ঠিক হবে? মা ও দুপুরকে একা রেখে আমার যাওয়া সম্ভব না। নাফিসা আসলে ভালো হতো। দুপুর নাফিসার উপর ভরসা করতে পারে। মনে মনে কথাগুলো ভেবে তন্ময় নাফিসাকে কল করে বিস্তারিত বললে নাফিসা বলল– আমি এক্ষুণি আসছি।

নাফিসা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় জিজ্ঞাসু  তার মাকে বলল– আমি তন্ময়ের বাসায় যাচ্ছি। দুপুর সিরিয়াসলি ইল।

মা কপালে চিন্তার ভাঁজ এঁকে বলল– এতো রাতে?

নাফিসা মায়ের বাহুতে হাত রেখে বলল– ভরসা রেখো।

সে আরেকদিন তন্ময়ের বাসায় এসেছিল। তাই বাসা চিনতে অসুবিধে হয়নি। পনের মিনিটের ব্যবধানে নাফিসা তন্ময়ের বাসায় এসে পৌঁছুলো।

ডোরবেল বাজলে তন্ময় দরোজা খুলে দিলো। দরোজা বন্ধ করতেই নাফিসা ব্যস্ত হয়ে বলল– কোথায় দুপুর? তোমার রুমে আছে?

তন্ময়– না, মায়ের রুমে। দুপুর মায়ের রুমে ঘুমিয়ে পড়েছিল তাই আর তুলে আমার রুমে আনিনি। মাকে আমার রুমে ঘুমুতে বলেছি।

কথাটি শোনার পর নাফিসা দুপুরের কাছে যেতে পা বাড়ালে তন্ময় পেছন থেকে নাফিসার হাত ধরে ফেলল। নাফিসা ঘাড় ঘুরিয়ে বিস্মিত চোখে তাকালে তন্ময় হাত ছেড়ে দিয়ে বলল– আজ দুপুরকে একটা সত্য কথা বলো।

তন্ময়ের কথা শুনে নাফিসা বলল– তুমি ছাড়া আমার কাছে বলার মতো কোনো সত্য নেই।

তন্ময়– আছে।

নাফিসা– তবে সেই সত্যটা তুমি আমাকে পড়িয়ে দাও।

তন্ময় বড় একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে একটু চুপ থেকে বলল– তোমার চোখ দুটি তানিয়ার।
নাফিসা যেন আকাশ থেকে পড়ল!

তন্ময়-দুপুরের মায়ের নাম তানিয়া। তানিয়া বিয়ের আগে মরণোত্তর চক্ষু দান করে গিয়েছিল। কিন্তু কে জানতো? আপাদমস্তক সুস্থ একজন গর্ভধারিনী বাচ্চা প্রসবের সময় স্ট্রোক করে মারা যাবে। দুপুর যখন মা ডাকতে শুরু করল। তখন আমি ওকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম। আমি ভাবতাম একদিন দুপুরকে তানিয়ার চক্ষুদানের বিষয়টি জানিয়ে মৃত্যুর কথা বলবো। যাতে দুপুর তার মায়ের চক্ষুদানের গৌরবে গর্বিত হয়ে মাতৃবিয়োগ ভুলে থাকতে পারে। আর তাই আমি দেশে এসে ওর মায়ের চোখ প্রতিস্থাপনকারী ব্যক্তিকে খুঁজতে থাকি। সে যেই হোক। পুরুষ কিংবা মহিলা। আমি কেবল চোখ প্রতিস্থাপনকারীকে খুঁজছিলাম দুপুরকে ওর মায়ের চোখজোড়া দেখানোর জন্য। তানিয়া স্বচক্ষে  দুপুরকে দেখে যেতে পারেনি। দুপুর অন্তত স্বচক্ষে ওর মায়ের চোখ দুটি দেখুক। তানিয়া সন্ধানী ঢাকা মেডিকেল কলেজ ইউনিটে চোখদান করেছিল। আমি ওখান থেকে অনেক খোঁজাখুজির পর চোখ প্রতিস্থাপনকারী মানে তোমার ঠিকানা খুঁজে পায়। যেই আমি ঠিকানা বরাবর তোমার কাছে যাই, গিয়েই আটকে পড়ি। দেখি, তানিয়ার চোখ। বিশ্বাস করো তানিয়ার চোখ দুটি আমি খুব ভালোবাসতাম। তাই নতুন করে আমি চোখদুটির প্রেমে পড়ে যায়। তোমার প্রেমে পড়ে যায়। যদিও তখনও আমি নিজেকে গোছাতে পারছিলাম না। আমি কি তোমার প্রেমে পড়ছি না কি তানিয়ার চোখজোড়া আমাকে নতুন করে প্রেমে ফেলছে। এখনও আমি তোমার মাঝে তানিয়ার চোখে ডুবে যায়। আমি ভাবি, চোখের দুর্বলতায় আটকে গিয়ে আমি তানিয়ার সাথে প্রতারণা করছি না তো? আর সেই সময়টায় তোমার চোখের দিকে তাকালে তানিয়া আমায় বলতো– চোখজোড়া রেখে এসেছি, যত্ন নিয়ো ভালোবেসে। আমার যেভাবে যত্ন নিতে চোখে চোখে রেখে। আমাকে যেভাবে ভালোবাসতে চোখের আড়াল না করে অবিকল সেইভাবে। আমাদের শুরুতে তোমাকে বিষয়টি বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু বলিনি কারণ তুমি যদি ভেবে বসো চক্ষুদানের বিনিময়ে আমি তোমাকে চাইছি।

এতক্ষণ নাফিসা চুপ ছিল। তন্ময়ের কথা শেষ হলে বলল– যার জন্য আমার অন্ধত্ব ঘুচল। যার চক্ষুদানে আমি চোখের আলো ফিরে পেলাম। আমার কাছে তার পরিবারের চাওয়াকে বিনিময় ভাববো?

কথাটি বলে নাফিসা দুপুরের কাছে খাটে গিয়ে বসল। দুপুরের কপালে হাত দিয়ে বুঝল এখন ওর জ্বর নেই। দুপুরকে ডাকল– দুপুর মামনি। মাম এসেছি।

দুপুর চোখ খুলতে খুলতে দুর্বল রোগীর মতো বলল– মাম মাম।

নাফিসা– তাকাও দুপুর। আমার দিকে তাকাও। আমার চোখের দিকে দেখো।

দুপুর মাম মাম বলে ডাকছে। নাফিসা ফের বলছে– দুপুর আমার দিকে তাকাও। আমার দুটি চোখের দিকে তাকাও। দেখো তোমার মায়ের সাদাকালো চোখ।

দুপুর চোখ খুলে নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল– মাম। নাফিসা দুপুরের গালে, কপালে চুমু দিয়ে পরম ভালোবাসায় বুকে জড়িয়ে ধরল।

রুমের দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে তন্ময় মা ও মেয়ের অনুপম দৃশ্যটি দর্শকের মতো দেখছিল। তারপর ধীর পায়ে তাদের কাছে এগিয়ে এসে নাফিসার কাঁধে হাত রাখল।

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]