আসুন, এই বগিটায় উঠি। লেখক বলেছেন, একটাতে উঠলেই হলো।

এটা একটা খুব সাধারণ বগি। শোভন। সাধারণ বগিতেই গল্প থাকে বেশি। সাধারণ মানুষের গল্প। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। খোলা চোখে দেখতে হবে। ধরতে হবে অন্তর দিয়ে।

আসুন। মনে রাখবেন, লেখক কিন্তু আমাদেরকে ফলো করছেন। সময় মতো তিনি আমাদের সাথে যোগ দিবেন। আমাদের কাজটা হচ্ছে, বগিটার প্রতিটি যাত্রীকে অবজার্ভ করা। হকাররাও বাদ যাবে না। প্রতিটা মানুষের প্রতিটি ঘটনাকে, প্রতিটা কার্যকলাপকে আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবো। যাত্রীদের কথা যথাসম্ভব খুব মন দিয়ে শুনবো। তাদের আচরণ দেখবো ও বিশ্লেষণ করবো।

ট্রেনটা বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়াবে না।

আজিমনগরের এই স্টেশনে এমনিতেই সব ট্রেন দাঁড়ায় না। হাতে গোনা কয়েকটা ট্রেন এখানে দাঁড়ায়। এই ট্রেনটা সেই কয়েকটারই একটা। যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে খুলনা। বড়জোর মিনিট পাঁচেক দাঁড়াবে এখানে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই কিছু স্থানীয় হকার, ভিক্ষুক ওঠে। বিভিন্ন সুরে তারা ভিক্ষা চায় যাত্রীদের কাছে। এরা বেশিরভাগ সময়ই একটা কথাই ঘুরে ফিরে বলে। ‘মায়ের ক্যান্সার’, ‘বউ হাসপাতালে’… ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই যে দেখুন, একটা অল্প বয়সী মেয়ে আসছে। দেখে মনে হচ্ছে খুব অসুস্থ। কিন্তু তার একেকটি স্টেপকে খেয়াল করে দেখুন। কী দেখলেন? অসুস্থ? অসুস্থ হলে স্টেপগুলো ছন্দবদ্ধ হবে না। কিন্তু তার প্রতিটা স্টেপ সতর্ক ও ছন্দবদ্ধ। তার মানে, সে চেষ্টা করে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। মানুষের কিন্তু এতকিছু খেয়াল করার সময় নেই। কেউ ইচ্ছে হলে দেয়, কেউ দেয় না। যারা দেয়, তারা নিছক সওয়াব পাবার আশাতেই দেয়। একটা যুক্তি মেনেই তারা সাহায্য করে। তাদের যুক্তি, তারা দান করছে লোকটার বা মেয়েটার করুণ অবস্থা দেখে। সেটা যদি অভিনয় হয়, তাহলে তার পাপের ভাগিদার সে-ই হবে। কিন্তু যারা দিচ্ছে না, তারা কোনো যুক্তি বা দয়ার ধার ধারে না। এই না দেয়া গ্রুপ আবার দুই কিসিমের। এক দল প্রতিদিনই প্রায় যাতায়াত করে। তারা এগুলোতে অভ্যস্ত, তাই মন টানে না। আর দ্বিতীয় দল দান খয়রাতে খুব একটা বিশ্বাসী নয়। তাদের বিশ্বাস, তারা নিজেরাই তো যথেষ্ট স্বাবলম্বী নয়— অন্যদের সাহায্য করবে কেমনে!

আরেকটা মেয়ে আসছে দেখুন। তার গায়ে নোংরা ড্রেস। তাকে দেখে কিন্তু বেশ সুস্থ মনে হচ্ছে। নাহ, পুরোপুরি সুস্থ নয়। এই মেয়েটার একটা হাত নেই মনে হচ্ছে। সেটা সত্যি নাও হতে পারে। তবে আপাতত সত্যি হিসেবে ধরে নিন। তার ধরনটা একটু আলাদা। সে ঠিক ভিক্ষে করছে না। সে একটা কাগজ বিলি করছে। কাগজে কিছু একটা লেখা আছে। লেখা আছে, আমার একটা হাত নেই। এ্যক্সিডেন্টে কাটা গেছে। কথা বলতেও পারি না। আমি ভিক্ষে চাই না। একটা করে ক্যান্ডি কিনুন। আমাকে সাহায্য করুন।

বাহ, এইটা বেশ দারুণ একটা আইডিয়া, তাই না? কয়েকটা ক্যান্ডি কিনে এদেরকে কিন্তু সাহায্য করাই যায়।

আচ্ছা, আমরা আর একটু এগোই। পরিবেশটা মোটামুটি দেখলাম। এখনও আমরা কোনো নির্দিষ্ট কিছু পাইনি যা গল্পের বিষয়বস্তু হতে পারে। আমাদের ফোকাস ও মনযোগ যে কোনো একটা বিষয় বা ঘটনায় কেন্দ্রীভূত করতে হবে। কিন্তু কী হতে পারে সেটা? এই যে, এই লোকটা, যে কিনা দেখতে কার্টুনের মতো, সে কি হতে পারে? লোকটা কারণ ছাড়াই হাসছে। মনে হচ্ছে কেউ তাকে কাতুকুতু দিচ্ছে। দিচ্ছে কি? হাতের দিকে তাকান। তার দুই হাতে অদ্ভুত ধরনের ব্যাগ। ব্যাগে কী থাকতে পারে, ধারনা করতে পারেন? তবে এখনই আমরা সাবজেক্ট ঠিক করে ফেলবো না। আরও কিছুক্ষণ পুরো বগিটায় চোখ রাখবো। ওই যে বোরখা পরিহিত বয়স্ক মহিলা বা ফ্রক পরা ছোট মেয়ে— যে কেউই আমাদের সাবজেক্ট হতে পারে। তবে এটাও ঠিক, পাঠকদেরকেও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তারা যেন সাবজেক্টটা পছন্দ করেন। ঠিকই বলেছেন, সবার পছন্দ এক নয়। কখনোই সেটা হয় না, হবেও না। তবে মেজরিটি সুড বি গিভেন প্রায়োরিটি। আরেকটা বিষয় আছে। সাবজেক্ট গুরুত্বপূর্ণ বা দৃষ্টিগ্রাহ্য না হলে উপস্থাপনা দিয়ে সেটাকে গুরুত্বপূর্ণ ও পাঠগ্রাহী করে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে— ঘটনা নয়, ঘটনার উপস্থাপনাই সাহিত্য।

গাড়ি ছেড়ে দিলো, না? এই রে, কেউ একজন হন্তদন্ত হয়ে উঠলো বোধ হয়! কে উঠলো রে বাবা এই শেষ মুহূর্তে। একটা মেয়ে, না? বুঝতেই পারছেন, খুব কমন একটা ঘটনা। গল্প বা চলচ্চিত্রে ট্রেনে একদম শেষ মুহূর্তে যারা ওঠেন, তারা সাধারণত নায়ক-নায়িকাই হন। অথবা নায়ক-নায়িকারাই এই ঘটনা ঘটান। সে যাই হোক। আমাদের জন্য লেখক হয়তো একটা নায়িকা পাঠালেন। এটা একটা এসাম্পশন- ধারণামাত্র। দেখা যাক।

এই মেয়েটা সুন্দর। শুধু সুন্দর না, খুবই সুন্দর। দুধে আলতা চেহারা। প্রথম দেখাতেই ভালো লাগে। ওমা, ডাক্তার বোধ হয়। গায়ে সাদা এপ্রোন। গলায় ব্যস্ত স্টেথোস্কোপ। নাকি নার্স? নাকি ইন্টার্নশিপ ডাক্তার? সে যা-ই হোক। তাকে আমরা একটু ফলো করতে পারি।

আচ্ছা, এই তবে আমাদের সাবজেক্ট, না? আপনারাও তো রাজি! জানতাম। লেখক হিসেবে এই ধরনের পরিচিত, কমন সাবজেক্ট খুব পছন্দ। কিন্তু এড়ানো গেলে ভালো। তারপরও কথা থেকেই যায়। এই কমন সাবজেক্ট-এর ভিতর থেকে যদি আনকমন কিছু বের করে আনতে পারেন, সেটা কিন্তু আবার বেশ প্রশংসনীয় ব্যাপার হবে। তবে আরও কিছু বিষয় আছে দেখার মতো। তাকে ঘিরে যদি কোনো ঘটনার জন্ম দিতে না পারেন, তবে এটাকে সাবজেক্ট করে কোনো লাভ নেই। ইদানীং গল্পের প্যাটার্ন অবশ্য চেঞ্জ হয়ে গেছে। গল্প দরকার হয় না। একটা চিত্র দরকার হয় শুধু। সেটাকেই জটিল করে, যেখান থেকে শুরু ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কথা বলে আবার সেখানেই এনে রাখাটাই গল্প। অর্থাৎ এখনকার গল্পগুলো হচ্ছে অনেকটা অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টের মতো। বুঝার তেমন কিছু থাকে না। কেবল চেষ্টা অথবা দৃষ্টিগ্রাহ্য সৌন্দর্য বা আপাত সৌন্দর্য থাকে। না বুঝলেও ভাবটা থাকবে এমন যে আপনি বুঝেছেন। এই রকম হোক, আর যে রকমই হোক, বুঝতে পারার প্রশংসাটা না থাকলে সবাই ধরে নেবে আপনি ব্যাকডেটেড। অতএব বুঝুন বা না বুঝুন, বোঝার ভানটুকু করুন, যদি জাতে থাকতে চান!

বগিটায় কিন্তু একটা সিটও ফাঁকা নেই। মেয়েটা এখন তবে বসবে কোথায়? দেখা যাক, এই বগিটা তাকে কীভাবে গ্রহণ করে। একটা কোথাও নিশ্চয় বসবে সে।

এপ্রোনের পকেট হাতড়ে মেয়েটা একটা টিকিট বের করলো। টিকিটটা না দেখে সে এদিক সেদিক খুব আগ্রহ নিয়ে তাকাতে শুরু করলো। কাউকে কি খোঁজ করছে? হতে পারে। একটু হতাশ হলো। মনে হয় যাকে খুঁজছে, তাকে পেলো না। এবার তার মনোযোগ টিকেটের দিকে। টিকিটের নম্বর আর সিট নম্বরটা কয়েকবার মিলিয়ে দেখলো। তারপর মোলায়েম কণ্ঠে এক মাঝবয়সী লোককে তার সিট ছেড়ে দিতে বললো। লোকটা প্রথম দিকে একটু আপত্তি করতে চাইলো বটে। কিন্তু মেয়েটার হাতে টিকেট আর চোখেমুখে দৃঢ়তা দেখে সাহস করলো না। সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর ‘তোকে দেখে নেব’ টাইপের একটা লুক দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। বোধ হয় লোকটার ইগো বেশ স্বচ্ছল। সে বগিটা ছেড়ে চিরতরে অন্য বগিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। কয়েকজনকে ইচ্ছে করেই জোর ধাক্কা দিয়ে চলে গেলো পাশের বগিতে। আমরা অবশ্য তাকে আর ফলো করবো না। এই চরিত্রটার খুব একটা দরকার আছে বলে মনে হয় না।

বরং মেয়েটার দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। এই বগির সবগুলো চোখ কিন্তু এখন এই মেয়েটার দিকে। কেউ কেউ কানাকানি করছে। দু একজন ‘হ, হ, ঠিক করেছে’, ‘কী সাহসী, দেখছেন’ ইত্যাদি মন্তব্য খুব নিচু স্বরে করছে।

চলুন, আমরা বগিটার অন্যপ্রান্তে যাই। তাহলে এপাশের যাত্রীদেরকেও ভালো ভাবে দেখতে পারা যাবে। এ বগিটার সিট সেই মান্ধাতার আমলের। চেয়ার কোচ না। বেঞ্চ-এর মতো। দুইপাশে দুটো বেঞ্চ। মাঝখানে হেলান দেয়ার একটা কমন ব্যবস্থা। প্রতিটা স্লটে যাত্রীরা বসে মুখোমুখি। সেজন্যই আমাদেরকে বগিটার অন্য প্রান্তে যেতে হবে।

এই এখানে দাঁড়ান। দেখুন। মোটামুটি একই চিত্র। তবে খেয়াল করুন, এদিকে মুখ করে যারা বসে আছেন, তাদের প্রায় সবাই পুরুষ। সেটা কেমন করে হলো? বেশ ইন্টারেস্টিং, না? আসুন, সবাইকে বেশ ভালোভাবে দেখি। স্টাডি করা হলো? একজনের উপর নিশ্চয় আপনাদের চোখ আটকে গেছে? জানতাম, আটকে যাবে। কী মনে হচ্ছে, এই সুদর্শন ছেলেটাই আমাদের গল্পের নায়ক হতে পারে? বুঝতে পারছি, আপনারা গতানুগতিক প্যাটার্ন থেকে বের হয়ে আসতে পারছেন না। সেটা অবশ্য খুব সহজ কাজও নয়। সে যাই হোক। যেমনটি আগেই বলা হয়েছে— গল্পের জন্য পাত্রপাত্রী বা ঘটনা মুখ্য নয়। উপস্থাপনাটাই মুখ্য। একই কাহিনীকে যদি আলাদা ফ্লেভারে উপস্থিত করতে পারেন, সেটাই পাঠককে টানবে। তো দেখুন, আপনারা কিভাবে এই ঘটনা এবং চরিত্রগুলোকে কাজে লাগিয়ে গল্পটা উপস্থাপন করেন। লেখক আমাদের সাথে আছেন। তাঁরও একটা ফিনিশিং টাচ থাকবে।

আমরা এখন এমন একটা জায়গায় নিজেদেরকে সেট করবো যেখান থেকে পুরো বগিটার প্রায় সবটুকু দেখা যায়। এই জায়গাটা ভালো, না? হ্যাঁ, মাঝামাঝি এই জায়গাটা। এখান থেকেই আমরা ছেলে ও মেয়েটাকে ভালো করে দেখতে পারবো।

মেয়েটা বসেছে। আচ্ছা, হঠাৎ করেই মেয়েটার মুখ-চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, না? আপনারাও খেয়াল করেছেন? তার মুখে একটা বেশ মিষ্টি হাসি। আপনারা তার এই হাসি, তার এই আয়েশি ভঙ্গিটাকে যতটা সম্ভব কাব্যিক করে উপস্থাপন করবেন। এখানে মেয়েটার বর্ণনায় কাটাতে পারেন কিছুটা সময়।

আচ্ছা, মেয়েটা চোখে চোখে মনে হয় কাউকে কিছু বললো, বা বলার চেষ্টা করলো! আমরা তার দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখতে পারি। হুমম, যা ভেবেছেন। পাঠকও এরই মধ্যে এই গল্পটা বোধ হয় ধরতে পেরেছেন। মেয়েটা নিশ্চয় ওই ছেলেটার দিকে তাকিয়েই একটা হাসি দিয়েছে? ছেলেটাও?

বাহ, তাহলে তো গল্পটা সহজ হয়ে গেলো, না? মেয়েটা এবার ঘন ঘন তাকাবে ছেলেটার দিকে। ছেলেটা কী করে তা দেখা যাক। সেও ব্যাপারটাকে বেশ উপভোগ করবে। তাই তো? আচ্ছা, ছেলেটাকে কি ভালোভাবে দেখেছেন? সে কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ নয়। মাঝে মধ্যে কাঁশছে। এই গরমেও তার গায়ে একটা পাতলা ব্লেজার। তার মানে জ্বর টর কিছু একটা হবে। কিন্তু মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে অসুস্থ।

ছেলেটা দুএকবার মেয়েটার দিকে তাকিয়েছে। রিটার্ন হাসিটা অনুকূল। এবার নিশ্চয় একটা প্রেমের সূচনা হবে এই বগিতে, তাই না? কী বলেন? আচ্ছা, আমরা দেখতে থাকি। লেখক আসছেন। তিনি এটাকে কিভাবে শেইপ দেন, সেটাও দেখার বিষয়।

ছেলেটার নাম জানা দরকার। সেজন্য আমরা পাশের চরিত্রগুলোর সহায়তা নিতে পারি। তারা যে গল্পগুলো করছে, সেখানে আমরা একটা রেখা নির্ধারণ করে দিতে পারি। অপ্রয়োজনীয় কথা ছেঁটে ফেলে সেইটুকু রাখা যেটুকু আমাদের পারপাস সার্ভ করবে। চলুন, কাছে যাওয়া যাক। কী কথা হচ্ছে, তা শোনা যাক।

— ভাই, আপনার গা তো পুড়ে যাচ্ছে। এত জ্বর নিয়ে কেন বের হয়েছেন?

— যেতে হবে দাদা। অনেক কষ্টে একটা পেপার রেডি করেছি এই প্রোগ্রামের জন্য। সেটা যদি উপস্থাপন করতে না পারি, প্রমোশনটা আটকে যেতে পারে! ‘স্যানিটেশন পলিসি এ্যন্ড হিউম্যান হেল্থ ইন দ্য রুরাল এরিয়া ইন বাংলাদেশ’-এর উপর একটা সেমিনার আছে কাল সকালে, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ অডিটরিয়াম-এ।

— ওহ। তা একটা নাপা খেয়ে নেন। ভালো কথা, আপনার নামটাই কিন্তু জানা হলো না। আমি মোহসিন। যশোর নামব। একটা সাহিত্য সম্মেলন আছে।

– আর আমি তৈমুর রায়হান। রায়হান নামেই সবাই চেনে…

বেশ। আমরা ছেলেটার নাম জানলাম। না জানলেও ক্ষতি ছিলো না। একটা নাম লেখক হিসেবে আপনি দিতেই পারেন। তো এটাও জানা গেলো, রায়হান একটা এনজিও-তে চাকরি করে। সম্ভবত কোনো হেল্থ অর্গানইজেশনে। খুলনা যাবে সে। একটা সেমিনারে প্রেজেন্টেশন আছে।

ছেলেটার বোধ হয় নতুন করে জ্বর আসছে। সে কাঁপছে ভীষণ। মোহসিন ছেলেটাও এই মেয়েটাকে দেখেছে। মেয়েটাকে ডাকবে কিনা ভাবছে হয়তো সে। কিন্তু ডাকার আগেই মেয়েটা সেখানে হাজির হলো। বুঝলেন কিনা, ভিতরে ভিতরে স্পার্কিং শুরু হয়ে গেছে।

মেয়েটা পাশের অপর জনকে একটু সরে আসতে বললো। তারপর একটু ঝুঁকে কপালে হাত রাখলো। এখানে আপনারা বেশ সময় নিয়ে দুজনের মনের কথা, অর্থাৎ কিনা অনুভূতি, লিখবেন। কল্পনাকে একটু বিস্তৃত করতে পারেন। সেটা কত দূর কিভাবে টেনে নেবেন, তা পুরোটাই নির্ভর করছে আপনাদের সামর্থের উপর, ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতার উপর। তবে যেহেতু উপন্যাস লিখছেন না, বাড়াবাড়িটা বেশি মাত্রায় না হলেই ভালো হয়।

মেয়েটা ছেলেটার কপালে হাত দেয়া মাত্র বগিতে একটা গুঞ্জন উঠবে। হ্যাঁ, এই তো। উঠেছে। প্রশংসা, কুৎসা- সবই আছে এতে।

এবার মেয়েটা পকেট থেকে থার্মোমিটার বের করে জ্বর মাপবে। বেশ মাঝারি একটা পার্স থেকে সে কিছু ওষুধও বের করবে। ওষুধ খাওয়ানোর পর আবার একটু কপালে হাত রেখে সিটে চলে আসবে।

দেখুন, যা ভাবা হয়েছে, তা-ই কিন্তু হচ্ছে! অবশ্য এটা ভাবার জন্য বিশেষ কোনো দক্ষতার প্রয়োজন হয় না।

পাশের ছেলেটা বোধ হয় ভদ্রতার ধার ধারে না। সে মেয়েটিকে সম্ভবত সিট ছেড়ে দেয়নি। তাই, বোধ হয় বাধ্য হয়েই, মেয়েটা তার জায়গায় ফিরে এসে মন খারাপ করে বসে পড়লো।

মন খারাপ মেয়েটা এবার আরও ঘন ঘন ছেলেটার দিকে তাকাচ্ছে। মনে হয় ছেলেটার প্রেমে পড়ে গেছে মেয়েটা। জ্বরের কারণেই হয়তো রায়হান মেয়েটাকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। আচ্ছা, মেয়েটার নাম জানা হলো না। আমরা পাশের মাঝবয়সী লোকটাকে কাজে লাগাতে পারি। নাহ, থাক। তারচে এক্ষেত্রে মেয়েটার একটা নাম আমরা দিতে পারি। মেয়েটার চেহারার সঙ্গে যায়, এমন কী নাম হতে পারে, বলুন দেখি?

মোনালিসা? নামটা একটু বড় হয়ে যায়। আর একটু ছোট হলে ভাল হয়। আচ্ছা, মোনালিসাকেই ছোট করুন না। মোনালিস, মোনা, লিসা, মোন (মন), মোনালি। ভেঙে যুক্ত করে মোনাসা বা মোলিও হতে পারে। কী? নালিসা? নাকি মোলিসা? সেটাও খারাপ না কিন্তু! আচ্ছা, মোলিসা বলে ডাকা যেতে পারে।

মোলিসার মন এই মুহূর্তে খুব ছটফট করছে। সে যে কোনো একটা ছুতোয় রায়হানের পাশে বসার চেষ্টা করবে। আমরা তাদেরকে একটু কাছাকাছিই আনি। এতে করে গল্পের ট্রাজেক্টরি লাইন যদিও বেশ সরল হয়, গল্প তার চার্ম হারিয়ে ফেলে, তবুও নবীন গল্পকার হিসেবে এটা করা যেতেই পারে।

ট্রেন এরই মধ্যে বেশ কিছু পথ চলে এসেছে। তবে আরও ঘণ্টা তিনেক লাগবে খুলনা পৌঁছাতে। এরই মধ্যে মেয়েটা বেশ কয়েকবার উঠে এসেছে ছেলেটার গায়ের জ্বর দেখার জন্য। যশোরে রায়হানের পাশের লোকটা নেমে গেলে মোলিসা এসে বসলো সেখানে। তার চেহারায় একটা লজ্জা লজ্জা ভাব কি আছে? না থাকুক। আপনারা এটাকে অ্যাড করতে পারেন। সেটা গল্পকে অধিকতর বাস্তবসম্মত করে তুলবে। সলজ্জ নারীরা পাঠকের সহানুভূতি পায় বেশি।

এখন দুজন দজনার সাথে পরিচিত হবে। মেয়েটার আগ্রহ যেহেতু বেশি, তাই প্রসঙ্গটা সে-ই তুলবে। তারপর মোবাইল নম্বর নেবে এক অপরের। ফেসবুক আইডিটাও বাদ যাবে না। তারা আর একটু ঘনিষ্ট হবে। জ্বর দেখার অছিলায় মোলিসা ঘন ঘন হাত ছোঁয়াবে রায়হানের কপালে, গালে আর বুকেও। সুযোগ থাকলে নিশ্চয় ছেলেটাকে সে কোলের উপর শুইয়ে নিতো!

এই দেখুন। ছেলেটা তার মোবাইল নম্বর বলছে। মেয়েটা তার মোবাইলে নম্বরটা তুলে নিচ্ছে। কল দিচ্ছে ছেলেটার ফোনে, তার নম্বরটা দেয়ার জন্য। কিন্তু এতক্ষণ কানে ধরে আছে কেন? কল ঢুকছে না নাকি? নাকি একটু পরে বলবে, ব্যালান্স নেই, সরি। কিন্তু কোনো কিছুই বোধ হয় ঠিক হলো না। সে তো কথা বলছে মোবাইলে। তার মানে, রায়হানের কাছ থেকে অন্য কারও নম্বর নিয়ে সেখানে ফোন দিয়েছে। কাকে?

একটু অস্বস্তি লাগছে কি আপনাদের? লাগাটাই স্বাভাবিক। হঠাৎ করেই আমাদের অনুমান কেন যেন কাজ করছে না। তার মানে পর্যবেক্ষণের মধ্যে আরও কিছু ত্রুটি আছে। আসুন, তাদের কাছাকাছি হই। আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি। তাদের ঘনিষ্ঠতা মনে হচ্ছে এখন একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। ছেলেটা মেয়েটার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে আছে। ছেলেটার দুটো হাত মেয়েটার মুঠোর মধ্যে। কামরা জুড়ে একটা মৃদু গুঞ্জন। প্রথম দেখাতেই এই রকম নির্লজ্জতা খুব কমই দেখা যায়। পার্কটার্ক হলে তবু না হয় একটা কথা ছিলো! এটা তো একটা পাবলিক পরিবহন। এখানে এই রকম ঢলাঢলির তো কোনে মানে হয় না! আমাদের দেশের কালচারটা তো আসলে এখনও এসব ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের জন্য অনুকূল না। এমন কি স্বামী-স্ত্রী হলেও না হয় একটা কথা ছিলো!

প্রবীণ দুএকজন কী ভাবছেন, সেটা একবার জানলে ভালো হতো, না? উল্টো পাশের সিটে বসা বয়স্ক লোকটা কিন্তু চরম বিরক্ত। মেয়েটার এই নির্লজ্জপনার একটা উপযুক্ত জবাব দিতে ইচ্ছে করছে তার। মনে হচ্ছে কড়া ভাষায় নিন্দা জানালে তবেই শান্তি! কী পেয়েছে মেয়েটা? মুরব্বী টুরব্বী এসব ছেলেমেয়েরা মানবে না কেন?

বেশির ভাগ যাত্রীর ভাবনাই কিন্তু এমন। তাদের এ রকম ভাবনার যথেষ্ট কারণও আছে। এই দুজন, বিশেষ করে মেয়েটা একটু বেশি অ্যাডভান্স। আমরা বুঝে পাচ্ছি না, যাত্রীরা মনে মনে এসব না ভেবে সরাসরি এসে দুটো কথা কেন শোনাচ্ছে না। আচ্ছা, আপনারাই বলুন, এসব কি ঠিক হচ্ছে? এইসব বেলেল্লাপনার জন্যই তরুণ প্রজন্ম শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ সময় লেখক যদি চলে আসতেন, আমাদের কিন্তু খুব সবিধা হতো!

এই যে, লেখক অনেক দিন বাঁচবেন। তার নাম নিতেই দেখি তিনি এসে হাজির! আচ্ছা চলুন। আমরা পরবর্তী ঘটনার জন্য তার নির্দেশের অপেক্ষা করি।

লেখক আমাদেরকে ইশারা করলেন তাকে ফলো করার জন্য। আসলে কী হতে যাচ্ছে ঠিক বুঝছি না। তিনি আমাদেরকে কিছু বলছেন না কেন? ও আচ্ছা, মানে তিনি নিজেই একটা চরিত্র হতে যাচ্ছেন। ঘটনা ব্যাখ্যা করার চাইতে ঘটনা প্রদর্শন বেশি কার্যকর। তিনি সম্ভবত এই পন্থাটাই নিতে যাচ্ছেন। আসুন, আমরা বরং তাকে ফলো করি।

লেখক এই জুটির কাছে যেতেই মেয়েটা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। চমকে গিয়ে বললো, মামা তুমি?

বাহ। লেখক তো দারুণ একটা চরিত্র নিয়েছেন! মামার চরিত্র। ভাগ্নিকে একেবারে বিব্রতকর অবস্থায় ‘কট’ করা! এবার নিশ্চয় ভাগ্নিটা তার বানিয়ে বানিয়ে অনেক গল্প শোনাবে ছেলেটাকে নিয়ে— ও অসুস্থ, ডাক্তার হিসেবে আমি আমার দায়িত্বটুকু করছি মাত্র, তাকে তো চিনি না মামা… ইত্যাদি ইত্যাদি।

আচ্ছা, এবার লেখক-মামা কী বলেন, সেটা শুনি।

একি! লেখক দেখি মেয়েটাকে কিছু না বলে উল্টো ছেলেটার কপালে হাত দিয়ে জ্বর মাপছেন!

কপালে হাতের স্পর্শ পেতেই ছেলেটা চোখ খুললো। লেখক-মামাকে দেখে সেও চমকে উঠলো, না? এ এক রহস্য তো!

ছেলেটা উঠতে যাচ্ছিলো। তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, তোমার গায়ে তো অনেক জ্বর!

— ও কিছু না মামা। কিন্তু তুমি এখানে কীভাবে এলে? দেখ তো, সুপ্তিকে কত করে বললাম, আসার দরকার নেই। কিন্তু ও কোনো কথাই শুনলো না। লালপুরে তাদের একটা মেডিকেল ক্যাম্প চলছে। ক্যাম্প ফেলে সে চলে এলো।

— ও ঠিকই করেছে। তোমার এই অবস্থায় একা একা আসা ঠিক হতো না। ও সাথে থাকলে বরং শারীরিক, মানসিকভাবে তুমি অনেক সাপোর্ট পাবে। সুপ্তি?

— বসো মামা।

— তুমি বসো। জামাইটার খেয়াল রাখো। আমিও যাচ্ছি তোমাদের সাথে। আমি যশোর থেকে উঠেছি। ইচ্ছে করেই তোমাদের বলিনি। আপা বললো, তোমরা খুলনা যাচ্ছো।

— তুমি না এলেও কিন্তু সমস্যা ছিলো না মামা। তবে ভালই হয়েছে। এক সাথে অনেক দিন আড্ডা দেয়া হয় না, বলো?

— সে তো অবশ্যই। ছুটিটা অবশ্য হঠাৎ করেই পেয়ে গেলাম। কাজের বুয়া দুদিন হলো বাড়ি গেছে, আসার কোনো কথা নেই। তোমার মামী বেচারা একাই সব সামলাচ্ছে। আমি গেলে তারও উপকার হবে। আর তোমরাও কদিন থাকলে। এক সঙ্গে কদিন থাকার এই রকম সুযোগ তো আর সব সময় আসবে না! এদিকে তো তোমরা আসোই না। এই একটা অজুহাতে তোমাদের দুজনকে পেয়ে গেলাম!

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]