‘ছি! লজ্জা করছে না আপনার?’

মুনিয়ার চোখের জল যেনো পোয়াতি শ্রাবণের জলধারা! বয়ে চলছে বিরামহীন। থামার নাম নেই।

বাহিরে চৈত্রের আকাশ, সূর্যটায় রাক্ষুসে তাপ!

চোখের জলের শ্রাবণে বিরাম এলো, চোখ মুছে নিচ্ছে ভার্সিটির পলিমার ক্যামিস্ট্রির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মুনিয়া। তবে তলপেটের ব্যথাটা অশান্তি বাড়াচ্ছে, খুব।

‘ম্যাম, বিষয়টা আমার ব্যক্তিগত; আপনার নরমাল সেন্সও নাই মনে হচ্ছে! আমার জায়গায় যদি আপনার মেয়ে হত, তাকে কি এত কথা বলতে পারতেন?’ আপেলরঙা পাতলা গড়নের মেয়েটা বকবকিয়ে মেয়েদের মতোন বলে গেল কথাগুলো, চোখে উত্তর পাবার নিরাসক্তি।

‘আপনার মেয়ে’ শব্দদ্বয় যেনো বুকের বামপাশের আবাদী উর্বর প্রেইরি খেতে লিকলিকে আগুন ধরিয়ে দিল। পঞ্চাশ বছরের বয়স পিরামিডে উত্তীর্ণ ডাক্তার মনিকা মুন যেনো চেম্বারে বসেও ফিরে গেলেন ঘরে, যেখানে হয়তো আজ মেহগনি গাছের কাঠ দিয়ে বানানো মধ্যবিত্ত ডৌলের পালঙ্কটা পড়ে থাকে; একটা পড়ার টেবিল এবং টেবিলের সাথে মাননসই একটা চেয়ার; আর কিছু নেই, দৈর্ঘ্যে পনেরো ফিট, প্রস্থে দশ ফিট দোচালা ঘরটায়। শুনতে যেমন বেঢপ, চোখের দৃষ্টিতেও তেমন বিশ্রী সে ঘর!

ঘরটা এমন ছিল না। চিরযৌবনা চাঁদটা নিয়ম করে প্রায়শ বাতাবিলেবুর পাতাকে ভেদ করে তিমিরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কড়াই কাঠের জানালা ছুঁয়ে ঠিক চুমু এঁকে দিত, তিনটা সুখী মানুষের কপোলে।

লাভ ম্যারেজ ছিল। মুবিন আশফাক, তিন মাস বয়সী দুহিতা মাইশা আর ডাক্তার মনিকা— ‘পৃথিবী’ নামের গ্রহের সবচে’ সুখী মানুষ ছিল যারা। আজ তারা নিখিলেস, রমা রায়ের মতোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মানুষ। কারো সাথে কোনো যোগ নেই, যেনো পৃথিবী একটা আস্ত বিরানভূমি! যেখানে কোনো মানুষ থাকে না। অমানুষে ভরে গেছে ইঞ্চি ইঞ্চি বসুধা! তুচ্ছ কারণে তালাকপ্রাপ্ত ডাক্তার তাই একা। তিন মাসের সন্তানটাকেও নিয়ে আসতে দেয় নি।

‘ম্যাডাম!’

মুনিয়ার বিরক্তি ভরা কণ্ঠস্বরে যেনো চৈতন্য ফিরে পেলেন ডাক্তার। যথাস্থান চেম্বারে মনোনিবেশ করলেন, বুকের ভিতরে কেমন ছ্যাত ছ্যাত করছে এখনো! এতদিন বাদে ঠিক পঁচিশ বছর আগে ফিরে গিয়েছিলেন মনিকা।

চশমাটা নাকের ডগা পর্যন্ত নামিয়ে এনে ডাক্তার লিখতে শুরু করলেন, প্রেসক্রিপশনে। মিনিট পাঁচেক সময় নিয়ে গোটা আটেক পথ্য লিখে দিলেন। কি সব নাম লিখলেন একটা অক্ষরও ধরা দায়! ডাক্তারদের হাতের লেখাই এমন।

‘কোথায় থাকা হয়, মেসে না হলে?’

নতমুখে থাকা মুনিয়াকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন।

হঠাৎ-ই যেনো ‘বোবা বনে’ রওনা করলো পঁচিশ বছর বয়সী মুনিয়া, ঠোঁট জোড়া লেগে আছে; খুলছে না।

তখন দুপুরের রোদটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। শিমুল ঝরা চৈত্রের দুপুর।

হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো মুনিয়া।

কি এমন কষ্ট মেয়েটার! তাৎক্ষণিক আন্দাজের চেষ্টা করলেন ডাক্তার। কিন্তু, বুঝতে পাচ্ছেন না।

‘মা, তুমি চুপ করো প্লিজ!’

মনটা কেমন জলের মতোন সরল হয়ে গেল মুহূর্তে। ঠিক চার বছর পর ‘মা’ ডাকটা শুনলো মুনিয়া, এমনটাই মনে হলো। কান্না থেমে গেছে ততক্ষণে। ভিতরটা কেমন শীতল হয়ে গেল ‘মা’ শব্দে।

চেম্বার ছেড়ে উঠলেন ডাক্তার। মুখে বললেন: চলো তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাই, ওখানে তুমি নিরাপদে থাকতে পারবে ক’দিন। ভেবো না, ভয়ের কিছু নেই।

যাবে? নাকি যাবে না? বিপরীতমুখী প্রশ্নরা মাথায় খোঁচা দিচ্ছে যেনো! না, এখন একটা নিরাপদ আস্তানা দরকার। অন্তত শরীরটা একটু সুস্থ করার জন্য। আর যাই হোক, মেয়ে মানুষের শরীর ঠিক তো তার দর ঠিক।

‘আচ্ছা, ম্যাম। চলুন।’

ক্লিনিকের গেট পেরুতেই রিকশাওয়ালার ভিড়।

‘আপা, মোর ইসকাত ওটো। মুই বাড়িত নামে দিম এলা। ভাড়া না হইলে পাঁচটা টাকা কম দেন! তাও চলো তোমরা।’

রিকশাওয়ালাদের এমন ন্যাকামি বাজে লাগে মুনিয়ার।

ডাক্তার একটু দূরে অবস্থানরত একটু বয়স্ক গোছের রিকশাওয়ালাকে ডাকলেন।

‘ভাই, আমাকে বাসায় নিয়ে যান না একটু!’

‘আচ্ছা, আপা। আইসো।’

রিকশায় উঠলো ডাক্তার ও মুনিয়া। রিকশা নির্বাচনে এমন সিদ্ধান্তে প্রথমে মুনিয়া অবাক হলেও এখন ব্যাপারটা বুঝতে পারলো। যে দুজন রিকশাওয়ালা পাঁচ টাকা কমেও নিয়ে যেতে চাইলো, ওদের রিকশা এই রিকশার মতোন ‘অটোরিকশা’ নয়। আর ওদের একজনের রিকশায় গেলে অন্যজন ঠিক পরে ঝগড়া বেঁধে দিত। তাই ডাক্তার বুড়ো চাচার রিকশা নিয়ে ভালোই করেছেন। ডাক্তার মহিলাটা তো দারুণ! সত্যি মগজে বুদ্ধি আছে।

প্রসব বেদনায় কুঁকড়ে যাওয়া অজগরের মতোন একটা পাকা সড়ক। রিকশায় বসে না গিয়ে হেঁটে যাওয়া শতগুণ নয়, হাজারগুণ ভালো ছিল। শরীরে ব্যথাটা কেমন চিনচিনিয়ে উঠছে।

যাক, এমন অন্ধকারের সময় ‘নিয়নবাতির আলো’র মতোন ডাক্তার ম্যাডাম পাশে দাঁড়ালেন। না হলে পড়াতে গিয়ে স্টুডেন্টের বাবার কাছে টগবগে যৌবনে পুষিয়ে রাখা সতীত্ব হারানো মেয়েকে এ জগতে কে ঠাঁই দেয়? বাপ-মা তো নাই, এতিমখানার বুয়া রুপসী চাচি ছিল মা আর রজিদ চাচা-ই বাবা। সড়ক দূর্ঘটনায় ওপারে চলে গেল, তারা। ততদিনে ভার্সিটি পর্যন্ত উঠেছে মুনিয়া। দুই-তিনটে টিউশনি-ই চলার ভরসা ছিল।

এখন তো ফোনটাও নাই, হারিয়ে গেছে গতরাতে দৌড়ে পালাবার সময়। না পালিয়ে উপায় কোথায়!

সন্ধ্যা সাতটা। কাজের মেয়েটা এখনো আসে নি, এবাড়ির। পারু পড়া শেষ করে পাশের গলিতে বান্ধুবীর বাড়ি গেছে, নোট আনতে; এইচএসসি পরীক্ষা সামনে। ওর মা ফেরে নি, অফিস থেকে। রাকেস সাহেব আছেন।

‘চা, খাবে?’

‘খাওয়া যায়। তবে ভাইয়া আমার এ মাসের টাকা আজ দিলে ভালো হত।’

‘আচ্ছা, দিচ্ছি।’ বলে মানিব্যাগটা খুঁজলেন, পেলেন, হাজার টাকার পাঁচটা নোট হাতে ধরিয়ে দিলেন মুনিয়ার।

ব্যস! তারপর। চায়েক সাথে তন্দ্রাঘন করার ওষুধ বোধ হয় মিশিয়ে ছিলেন। তারপরের ঘটনা কিছুই মনে করতে পারে না মুনিয়া। যখন চৈতন্য ফিরে আসে, তখন নিজের শরীরের কাপড়-চোপড় সব এলোমেলো। ঝাপসা চোখটা দেয়ালঘড়িতে পড়লে দেখে রাত নয়টা। বাসা সুনসান। ভাবি, কাজের লোকটা, পারু কেউ ফেরে নি। জানোয়ারটা নিশ্চিত পালিয়েছে।

কোনো মতে নিজেকে সামলে রাতের আঁধারে পালিয়ে এই মফস্বল শহরে আসে মুনিয়া। মামুন হয়তো ওকে ফোনে, ফেসবুকে না পেয়ে মেস অবধি খবর নিয়েছে। গর্ভপাতটা করানো ঠিক হলো কিনা জানে না মুনিয়া, তবে ও মামুনকে বঞ্চিত করলো। কোনো দিন ওকে জড়িয়ে পর্যন্ত ধরতে দেয় নি মুনিয়া। অথচ গতরাতে…!

ডাক্তার ভাবছে আরেক কথা। বাড়ি সেই বরিশাল, আর পড়ে আছে গত ছয় বছর ধরে রংপুরে, বিভিন্ন উপজেলায় ছিল। এর আগে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্টসে কাজ করেছে। তবে রংপুরে গত পাঁচটা মাস কেটেছে আরামে, ডাক্তারি কোনো জ্ঞান না থেকেও বড় ডাক্তারের সাথে থেকে থেকে চেম্বারে বসার সুযোগ হয়েছে। এরচে’ বড় সুখ আর কি!

মনে মনে মুনিয়া বললো: এবার আগে সুস্থ হতে দাও, তারপর দেখবো রাকেস বাবু তোমার কত ক্ষমতা! চৌদ্দ শিকের ঘরে তোমারে ঢুকাতে না পারলে আমি মুনিয়া না।

মিনিট ত্রিশ সময় লাগলো। একটা বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো রিকশাটা। আশেপাশে কোনো বাড়ি নেই, আছে বাঁশঝাড়।

রিকশাওয়ালা ভাড়া নিয়ে চলে যাবার আগে মুনিয়াকে দেখে অদ্ভুত একটা হাসি দিল, খুব ভয়ানক! ভীষণ অচেনা মনে হলো লোকটাকে।

‘কি হলো? ভিতরে চলো!’

হাত ধরে বাসার ভিতরে মুনিয়াকে নিয়ে গেল ডাক্তার। এত্ত সুন্দর বাড়ি! বাহির থেকে বোঝা যায় না, পাঁচিলের জন্য।

‘কি জপিদ ভাই, বাড়ি আছো?’

‘আরে ডাক্তার, কি খবর? ‘

‘দেখতেই পাচ্ছো, চলবে কি না এটা দেখো তো, এবার আমারে টাকা পাঁচ লাখ দিতে তো তোমার সমস্যা নাই, কি বলো?’

‘ওহ! সেই জিনিস আনছো, তোমারে কি দিয়ে যে খুশি করব!’

‘কিছু লাগবে না। তোমার কাছে টাকা চাইতাম, তুমি ভাই এমনি এমনি দিতে না, আগের দুইটার এক আর এটার চার মিলে পাঁচ দাও, আমি ঢাকায় যাই। রংপুর টু ঢাকা। ইয়াহু, কি মজা!’

মুনিয়া যেনো নিজের কান, চোখকে বিশ্বাস করতে পাচ্ছে না। কি হচ্ছে এসব!

‘হ্যাঁ, তাই ভালো। তোমার এ চাকরি তো আর করে লাভ নাই। তুমি ঢাকায় যাও, ফেসবুকে নক দিও। নতুন যত দিবা বিদেশী বাবুরা তত রুপি, ডলার দিবে, কমিশন পাবা তুমি; জীবন ফুরফুরা তোমার…”

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]