মেয়েদের দিকে না তাকানোটা মেয়েদের জন্য এক প্রকার অপমান বটে। আর সেটা যদি হয় সেজে থাকা কোনো মেয়ে কিংবা সুন্দরী কেউ, তাহলে তো ভীষণ অন্যায়। আমিও আমার সামনে থাকা তিন সুন্দরীর দিকে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকাচ্ছি। আমার দৃষ্টি দিয়ে তাদের প্রাপ্য এপ্রিসিয়েশন দিয়ে চলেছি। তবে সেটা খুব সন্তপর্ণে। কেউ মেয়েদের দিকে বারবার তাকাচ্ছে, আবার সেই মানুষটি যদি হয় আশানুরূপ বয়স সীমার ভেতরে ।এটা মেয়েদের আত্মতুষ্টি দেয়।তাদের মনে হয় সাজটা তাহলে ঠিক আছে। ড্রেসের সাথে ম্যাচিং করে চুলের খোপা, আইলাইনার, লিপিস্টিক, পায়ের হিল কিংবা ভ্যানিটি ব্যাগ সবই ঠিক আছে। এতে মন তরলীভূত হয়। তখন খুশিখুশি মেজাজে অনেক বেশি কথা বলতে শুরু করে। কণ্ঠের উচ্চতাও বেড়ে যায়। আমাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না তাদের আলোচনায় মনোনিবেশ করতে। আমি এবং আমার পাশের যাত্রী এই আলোচনায় নীরব শ্রোতা। অবশ্য আমার পাশের যাত্রী শুনছে কিনা আমি ঠিক জানি না। আমার সাথে দুয়েকটা কথা বলে জমাতে পারেনি দেখে চুপ হয়ে গেছে। সাধারণত মানুষ ভ্রমণ করলে অনেক বেশি কথা বলতে চাই। আমি বরাবরই কম কথা বলার মানুষ। সৌজন্যতার খাতিরে যতোটুকু কথা হয় ততোটুকুই। বেশি সময় ভেবেই কাটাই। আজকাল প্রথম শ্রেণির ট্রেনগুলোও লোকাল হয়ে গেছে। সব সময় মাছের বাজার লেগেই থাকে। আসন সংখ্যার অধিক মানুষ দাঁড়িয়ে যায়। হকার, ভিক্ষুক, মাঝে মাঝে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের উৎপাত, সে এক বিতিক্রিসি অবস্থা। তারপরেও আমি ট্রেনেই যাতায়াত করি। বর্তমান দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে ট্রেনই সেইফ বটে। আমি বাস্তববাদী মানুষ। তাই তাড়াতাড়ি মরতে চাই না। পৃথিবীর সব রকম স্বাদ নিতে চাই আমি। তারপর না হয় একদিন প্রয়োজন ফুরালে চলে যাব।

আমি চেষ্টা করি জানালার পাশে সিট নিতে। এতে যেমন ট্রেনের কামরায় থেকেও ট্রেনের বিচিত্র সব দৃশ্য এড়ানো যায়, আবার খুব সহজেই উদাসীন হওয়া যায়। আমি এই পরিবেশটা খুব উপভোগ করি। প্রত্যহ শহরের যান্ত্রিকতায় বন্দী বিক্ষিপ্ত মন পানির মতো তরল হয়ে যায়। আমার সবকিছুকে আপন লাগতে থাকে। মনে হয় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে বলি ভাই একটু বসুন। মনে হয় ভিক্ষুকটাকেও দুটো টাকা বেশি দেই। হিজড়াটাকেও ডেকে বলি সমাজ তোমাকে দূরে ঠেলে দিলেও আমি তোমাদেরই লোক। তেমন করেই আপন লাগছে আমার সামনে বসে থাকা সমাজের উচ্চশ্রেণির তিন আদুরে কন্যাকে। একজনের কণ্ঠে হাহাকার আব্বু স্টেশনে ঠিক সময়ে গাড়ী পাঠাবে কিনা! তাদের কথা উড়তেই থাকে আকাশ বাতাস। কর্শিকা, জাফনা, মাদ্রিদ হয়ে সিডনি, নরওয়ে, কিংবা বার্লিন। কখনো হিরণ ভাই, এইট প্যাক, চকলেট অথবা স্ট্রবেরি ফ্লেবার, নাইট ক্লাব, ব্র্যান্ডি, রানু ভাবির মেদ কিংবা ফ্লোরার বিয়ের প্রস্তাব।


.

আগে কয়েকটা ভিক্ষুক এসেছিলো। এখন আসলো কয়েকটা হিজড়া। একজন বিরক্তি নিয়ে বললো–”এরা টাকা উঠাচ্ছে কেন? যাচ্ছেতাই অবস্থা দেখছি। কেন যে এসি রুমে সিট পেলাম না!” অবেশেষে একজন টাকা দিয়ে বিদেয় করলো। কিন্তু দুয়েকটা কথা কাটাকাটিতে সবাই কেমন ইতস্ততবোধ করতে লাগলো। হিজড়াদের প্রতি বিরক্তিভাবটা আমারও আসে। কিন্তু আমি ব্যপারটাকে স্বাভাবিক হিসেবেই নেই। আমার কাছে মনে হয় তাদের মানুষকে এই বিরক্তি করার কিছুটা অধিকার আছে। আমাদের সিস্টেম সেটা করে দিয়েছে। সমাজে আর সব মানুষের মতো স্বীকৃতি না পেয়ে বিরক্তি করাটাকেই কি তারা বিদ্রোহ হিসেবে ধরে নেয়?

মেয়েগুলো একগাদা খাবারের অর্ডার দিলো। স্যান্ডউইচ, চিকেন কাটলেট, ব্রিরিয়ানি, কোক। কেউ ফোন টিপছে, কানে হেডফোন। মাঝে মাঝে হেসে ফেটে পড়ছে। আমি পাশের যাত্রীর সাথে আলাপ শুরু করলাম। আমার গলার স্বর ওদের মতো উচ্চ নয়। এমনভাবে কথা বলছি যেন পাশের যাত্রীই শুধু শুনতে পায়। হাসিহাসি মুখ করে রেখেছি। তৈলাক্ত মুখে জানালা দিয়ে রাজ্যের ধুলোবালি লেগে আরো বেশি কালো হয়ে গেছে। ঊনার নাম রোমেল। ব্যাচেলর। ছোটখাট ব্যবসা করছে। গন্তব্য কমলাপুর। আলাপচারিতায় দেখা গেল আমরা একই বিভাগের লোক। উনি কলা কিনলেন। আমাকেও খেতে দিলেন। সাধারণত ট্রেনে কিংবা বাসের মধ্যে আমার কিছু খাওয়া হয় না। ইতস্তবোধ হয়। মনে হয় আমি এমন কারো ক্ষুধা বাড়িয়ে দিচ্ছি যার হয়তো শুধু যাওয়ার টাকাটাই আছে। খাওয়ার অতিরিক্ত টাকা নেই। নিজে থেকে আন্তরিক হয়ে খাওয়ানোর সামর্থ্য সবসময় থাকে না। যাই হোক, ইতস্ততবোধে কাজ হলো না। আমাকে খেতেই হলো। এতক্ষণ আমার হাবভাব দেখে বুঝতে না পারলেও এই প্রথম মেয়েগুলো হয়তো বুঝলো আমি মধ্যবিত্ত।

মৃদু বাতাসে আর ট্রেনের হালকা দুলুনিতে আমার ঘুমঘুম ভাব এসে গেল। কিন্তু আমার কেমন অস্বস্তিবোধ হতে লাগলো। মেয়েগুলোই অস্বস্তির কারণ। এদের দৃষ্টির সামনে আমি অনেক কাজই স্বাভাবিক করে ভাবতে পারছি না। ট্রেনে ঘুমানোটাই স্বাভাবিক। অনেকেই ঘুমাচ্ছে। কিন্তু আমি পারছি না। চোখ বন্ধ করলেই মনে হচ্ছে কেউ একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার সামান্য মাংসপেশির নড়াচড়াও লক্ষ করছে। এটাই আমাকে আড়ষ্ট করে তুলছে। কারো দৃষ্টির প্রভাব যে কখনো কখনো নিজের স্বাধীনতায় সংকোচ ধরিয়ে দেয় আমি প্রথম উপলব্ধি করলাম। অথচ মেয়েগুলোর কারো সাথেই আমার কথা হয়নি। আমাদের শ্রেণি পার্থক্যটাই হতে দিচ্ছে না হয়তো। কোথাও একটা দেওয়াল আমরা তুলে দিয়েছি। সেটাই ভাঙতে পারছি না।


.

ট্রেন বঙ্গবন্ধু সেতুপূর্ব স্টেশনে এসে থামলো। সেতুতে ওঠার আগে এখানে কিছু সময় থামে। আর এখানেই বিভিন্ন রকম হকারের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। বিশেষ করে সিঙ্গারা আর ঠান্ডা পানি বিক্রেতায় ভরে যায়। রোমেল ভাইকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন তিনি ফল ছাড়া এইসব খান না। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। তখনো দুপুর রোদের ঝাঁজ গায়ে এসে লাগছে। স্টেশনের কাজ চলছে হয়তো। নতুন রেইলগুলো ফেলে রাখা হয়েছে যত্রতত্র। এর মধ্য দিয়ে হাঁটা বেশ কষ্টকর। কয়েকটা বাচ্চা মেয়ে। বয়স ৫ কিংবা ৬ হবে। কোমরে পানির জগ আর হাতে গ্লাস নিয়ে ট্রেনের কোল ঘেসে দাঁড়িয়ে পড়লো। মুখে কোনো কথা নেই। কেমন মায়ামায়া চাহনি। মুখটাও রোদে পোড়া। অন্য হকাররা যেখানে জোরে জোরে হাঁক সাড়ে সেখানে ওদের তেমন কিছুই করতে দেখলাম না। শুধু চেয়ে আছে। ওদের চোখ খুজে চলেছে অন্য কোন চোখ। সে চোখ বোধহয় সবার থাকে না। সবাই এটা ওটা কেনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সামনের মেয়ে তিনটাও সিঙ্গারার প্যাকেট নিয়েছে কয়েকটা। সাথে ঠান্ডা পানি। আমি বাচ্চা মেয়েগুলোকে দেখছি। আমি ভাবলাম ওরা বোধহয় শুধু দুজনই। আমার ভুল ভাঙলো জানালা দিয়ে মাথা বের করে। এদের সংখ্যা বেশ কয়েকজন। আমার ঠান্ডা পানির তৃষ্ণা আগেই পেয়েছে। ইচ্ছা করলেই ট্রেনের ভেতরের কোনো হকার থেকে কিনে নিতে পারি। কিন্তু আমার মধ্যে ইচ্ছাটা আসছে না। এতগুলো বাচ্চা মেয়ে এই রোদে পানি হাতে দাঁড়িয়ে আছে অথচ কেউ তাদের থেকে কিনছে না। অনেক শিশুই ভিক্ষা করে। আমরা তাদের দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি দেখলাম এরা ঠাই দাঁড়িয়ে আছে। একই জায়গায়। মুখে কথা নেই কিন্তু এদের দৃষ্টির ভাষা বড়ই করুণ। বুকে কোথাও হাহাকার জাগিয়ে দেয়। আমার মনে হলো খুব মায়া চেহারার মেয়েটিকে বলি আমাকে একগ্লাস পানি দাও। হাতে কয়েকটা টাকা ধরিয়ে দেই। কিন্তু কয়জনকে দেব? তার পাশের জনও দাঁড়িয়ে আছে। আমি লক্ষ্ করলাম আমার কাছে ভাংতি টাকা নেই। যতটা আমি মনে মনে দিবো বলে ঠিক করেছি ততোটা নেই। আমার মধ্যে অস্থিরতা বাড়তে লাগলো। ট্রেন যখন তখন ছেড়ে দিতে পারে। আমার ওর হাতের পানি খাওয়া হবে না। আমি প্রতারক হয়ে যাব। কিছুক্ষণ আগেই মনে মনে মেয়েটাকে আমি কিছু টাকা দিয়েছি। এখন না দিলে প্রতারণা হয়ে যাবে। আমি মেয়েটাকে ডাকবো বলে ঠিক করলাম। দেখি মেয়েটা বাইরের একজন বয়স্ক লোককে পানি খাওয়াচ্ছে। আমি তার পাশের মেয়েকে ঢাকলাম। বললাম এক গ্লাস পানি দাও। কিন্তু আমার অস্থিরতা কাটছে না। যাকে ডাকবো বলে ঠিক করেছিলাম তাকে তো ডাকলাম না। মনে মনে নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগলো। এমন সময় রোমেল ভাই ঝুঁকে এলেন। তার হাতের বোতলটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন– ওকে বলুন এটা ভরে দিক। আমি মেয়েটাকে বোতলটা দিয়ে বললাম এটা ভরে দাও। মেয়েটা খুশিতে বোতল ভরতে থাকলো। খুশিটা কত সেটা বুঝলাম তার হাত কাঁপা দেখে। বেশির ভাগ পানিই বোতলের বাইরে দিয়ে পড়ে যাচ্ছে। আমি লক্ষ্য করলাম, যে মেয়েকে আমি ডাকবো ভেবেছিলাম তার পানি খাওয়ানো হয়ে গেছে। আবার আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। আমি মেয়েটাকে ডাকলাম। তার কাছে থেকে পানি খেলাম। এবং সামান্য কিছু টাকার মানুষকে খুশি করার ক্ষমতা দেখে মনে হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের মোহটা ভুল দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এই সমাজ যন্ত্র আমাদের শিক্ষিতের চাকচিক্যময় মোড়কে আবদ্ধ করে রাখে শুধু। ভেতরের অশিক্ষা থেকেই যায়। আমাদের শিক্ষা হওয়া উচিৎ ছিলো আরো বেশি জীবনকেন্দ্রিক। বিবাহযোগ্যদের জন্য ‘সমাজ ও জীবন’-বিষয়ক বাধ্যতামূলক শিক্ষা হওয়া উচিৎ ছিলো। আমাদের বোঝা উচিৎ শুধু সন্তান জন্ম দেওয়াতেই পুরুষত্ব নেই। “আমাদের সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”– শুধু চেয়ে গেলেই হবে না। পৃথিবীতে নতুন একটা মানুষকে আনার আগে ভাবতে হবে তার অবস্থান কোথায় হবে। মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে খাবে নাকি পানির জগ হাতে স্টেশনে ঘুরবে ?

রোমেল ভাইয়ের সাথে এই নিয়ে বেশ কিছু কথা হলো আমার। মেয়েগুলো শুনলো কিনা জানি না। শুধু তাদের মধ্যে থেকে একজন জিজ্ঞেস করলো “ভাইয়া আপনি কোথায় নামবেন?” আমি বিমানবন্দর নামবো জানালে  আমার সাহায্য চাইলো। আমি যেন ব্যাগটা নামিয়ে দেই। সুন্দরীদের আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার মতো মহাপুরুষ জগতে কমই আছে। আমিও সাড়া না দিয়ে থাকতে পারলাম না। রোমেল ভাইকে বাই জানিয়ে বিমানবন্দরে নেমে আসলাম আমরা চারটি মানুষ। যাদের সাথে দীর্ঘ ছয় ঘন্টার ভ্রমণে একটিও কথা হয়নি। কেন জানি লক্ষ করলাম তারাও আমার উপরে একটা নির্ভরতা পাচ্ছে কিংবা হয়তো ভাবছে মানুষের সব অসহায়ত্বে হাহাকার করা কেবল মধ্যবিত্তেরই কাজ। আমি প্লাটফর্ম ছেড়ে রিক্সা খুজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এর মধ্যেই ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। সামনে এগিয়ে যাচ্ছে আপন গতিতে। সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে নাইট ক্লাব, ব্র্যান্ডি, ঝালমুড়ি, সিঙ্গারা কিংবা এক গ্লাস পানির মতো অসংখ্য জীবন।

[ ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন ]